Blogger Api

Blogger Api

Share

Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Blogger Api, Writer, Gazipur.

28/03/2026

#হৃদয়ের_স্পন্দন_তুই
#তাসলিমা_তানজুম
#পর্ব-১৪

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]

রাত তখন সাড়ে এগারোটা ছুঁইছুঁই। বাড়ির সবাই যে যার ঘরে চলে গেছে। ফারজানা প্রথম সিঁড়িতে বসে ছিল। হঠাৎ একটা শব্দ পেয়ে ও পিছন ফিরে তাকাল। দেখল, রোদেলা ঋদ্ধর রুম থেকে বেরিয়ে আসছে। রোদেলার হাতে একটা ট্রে, তাতে খালি প্লেট আর গ্লাস রাখা।

ফারজানা মনে মনে ভাবল, —“কী ঢং! ছাদে অতগুলো ফুল ছিঁড়ল, অথচ ঋদ্ধ ভাইয়া কিছুই বলল না। এখন আবার রাতের বেলা খাবার নিয়ে আসা হয়েছে। কত বুদ্ধি মেয়েটার! যাতে ফুল ছেঁড়ার জন্য পরে আর বকা না খেতে হয় — তাই আগেভাগেই মন ভোলানোর চেষ্টা চলছে।”

রোদেলা ফারজানাকে পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ফারজানা নিচু স্বরে তাচ্ছিল্য করে বলে উঠল —

— “কী রে, এত রাতে ঋদ্ধ ভাইয়ার ঘরে খুব তো খাতিরদারি চলছে! ফুল ছেঁড়ার অপরাধ ঢাকতে এখন বুঝি খাবার দিয়ে মন ভোলানোর চেষ্টা হচ্ছে?”

ফারজানার কথা শুনে রোদেলা থমকে দাঁড়াল। একপলক ফারজানার দিকে তাকাল। কিন্তু কিছু না বলেই চুপচাপ নিচে নেমে কিচেনের দিকে চলে গেল। রোদেলা ভালো করেই জানে, ফারজানার কথার জবাব দেওয়া মানেই একটা বড়সড় ঝগড়া সৃষ্টি হবে। ফারজানা রোদেলার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রাগে গাল ফুলিয়ে রইল, তারপর উঠে নিজের রুমে চলে গেল।

রোদেলা কিচেনে গিয়ে ট্রে, গ্লাস আর প্লেটগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে রাখল। এরপর আর দেরি না করে সরাসরি নিজের রুমে চলে গেল।
:
রোদেলা নিজের রুমে ঢুকে দেখল রাইসা বিছানা গুছিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। রোদেলা দরজা বন্ধ করে চুপচাপ নিজের বিছানায় গিয়ে ধপ করে বসে পরল। রোদেলাকে ওভাবে বসতে দেখে রাইসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর ওকে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,

—“তুই এখনও আমার ওপর রেগে আছিস?”

রোদেলা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল— “কই, না তো।”

—“নাহ, সত্যি করে বল।”

—“আরে সত্যি বলছি, রেগে কেন থাকব?”

রাইসা দমল না, ও রোদেলার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল— “আমার সাথে সেদিন অমন কেন করলি?”

—“কোন দিন?” রোদেলা এমন ভান করল
যেন, রাইসার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল।

—“ভুলে গেলি?”

—“আশ্চর্য!”

—“কী আশ্চর্য! সেদিন আমার সাথে খারাপ ব্যবহার কেন করলি? উত্তরটা দে।” রাইসা এবার একটু জেদ ধরেই বসল।

রোদেলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, —“আচ্ছা বলছি, সেদিন আমার মন-মেজাজ ভালো ছিল না, তাই এমন ব্যবহার করে ফেলেছিলাম। এজন্য এত কষ্ট পাস না তো, আর ভালো লাগছে না। আর আমি খারাপ ব্যবহার করেছি বলেই কি তুই কষ্ট পাবি।”

—“তো খারাপ ব্যবহার পেলে কে না কষ্ট পায়?” রাইসা অভিমানের সুরে বলল।

—“আচ্ছা, সরি। এমন আর কখনো করব না।”

—“তোর সরি তোর কাছেই রাখ। আগে বল, আমার সাথে কেন খারাপ ব্যবহার করেছিলি? আমি এমন কী করেছিলাম?”

রোদেলা এবার একটু বিরক্ত হয়েই বলল, —“তুই কিছুই করিস নি। বললাম তো, সেদিন মন-মেজাজ ভালো ছিল না, তাই এমন ব্যবহার করে ফেলেছিলাম।”

—“মেজাজ খারাপ থাকলেও তুই কখনো আমার সাথে এমন ব্যবহার করিস নি, যদি না আমি কোনো ভুল করে থাকি তো।”

রোদেলার আর এসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল, —“আচ্ছা থাক, বাদ দে না টপিকটা। যা চলে গেছে, তো গেছে। অতীত টেনে আনিস কেন বারবার? সরি বলেছি, ক্ষমা করে দিবি — ব্যাস! এত কথা কেন বলছিস? অনেক রাত হয়েছে, এবার ঘুমিয়ে পড়।”

—“না, আমি সত্যিটা না জানা পর্যন্ত ঘুমাব না, আর না তোকে ঘুমাতে দেবো।” রাইসা এবার নাছোড়বান্দার মতো জেদ ধরল।

রোদেলা এবার একটু হেসে বলল, —“যাহ্ বাবা! আচ্ছা ঠিক আছে বলছি। সেদিন ওই ঘোড়ার ডিম খবিশটা আমাকে থাপ্পড় মেরেছিল। আর তাই আমি প্রচণ্ড রেগে ছিলাম, যার জন্য তোর সাথে এমন ব্যবহার করেছি। আমি ভাবতেও পারিনি, ওই খবিশটা আমার গায়ে হাত তুলবে।”

রাইসা মুখ বাঁকিয়ে বলল, —“মিথ্যে কথাটাও ভালোভাবে বলতে পারিস না। তুই কিন্তু আমাকে সেদিন সকাল থেকেই ইগনোর করেছিলি।”

—“কী জানি আমি আবার এমন কখন করলাম! আমার কিছু মনে নেই। বাদ দে এখন, ঘুমাবো। অনেক ঘুম পাচ্ছে।” এই বলে রোদেলা চাদর টেনে শুয়ে পড়ল।

রাইসা এবার বিছানা থেকে উঠে রোদেলার কাছে গিয়ে বসল। রোদেলার হাতটা ধরে নরম সুরে বলল,

—“আমার থেকে যদি তুই কোনো বিষয়ে কষ্ট পেয়ে থাকিস, তাহলে আমাকে খোলাখুলি বলে দে। তা না করে এভাবে মনের মধ্যে কষ্ট কেন লুকিয়ে রাখিস, বল তো?”

রোদেলা উঠে বসে রাইসার হাত ধরে আশ্বস্ত করে বলল, —“বোন আমার, আমার মনে কোনো কষ্ট নেই। তুই প্লিজ এসব নিয়ে আর ভাবিস না। আমি আর কখনো এমন করব না, সত্যি।”

—“তার মানে তুই এখনও সত্যিটা বলবি না আমাকে, তাই তো?” রাইসা কিছুটা হতাশ হয়ে বলল।

রোদেলা এবার মিষ্টি হেসে বলল, —“তুই এমন কেন রে? বললাম তো, তোর ওপর আমি রেগে নেই। ওইদিন আমার মন-মেজাজ সত্যিই ভালো ছিল না। তাই এমন ভুল করে ফেলেছিলাম। এখন প্লিজ, ঘুমিয়ে পড় লক্ষীবোন আমার। আমাকে একটু ঘুমাতে দে। সকালে আবার সময়মতো উঠতে না পারলে তো আম্মুর হাতে খুন্তির বাড়ি ফ্রিতে পেতে হবে।”

রাইসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও বুঝতে পারল আজ আর রোদেলার মুখ থেকে কথা বের করা যাবে না। নিজের বিছানায় গিয়ে বসে মনে মনে ভাবল, —“কিছু তো একটা মনের মধ্যে চলছে, যেটা ও আমাকে বলতে চাইছে না।”
:
:
খোলা জানালা দিয়ে আসা ভোরের আলো সরাসরি এসে পড়ল রোদেলার চোখ-মুখে। ঘুমের ঘোরেই ও ভ্রু কুঁচকে বালিশে মুখ গুজল। সারা রাত মশার কামড়ে এক ফোঁটা ঘুমানোর জো ছিল না, তার ওপর মাথায় রাজ্যের চিন্তা ঘুরপাক খেয়েছে। সব মিলিয়ে শরীরটা বেশ ভার হয়ে আছে ওর।

হঠাৎ কী মনে করে রোদেলা ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। আড়মোড়া ভেঙে পাশের বিছানার দিকে তাকাতেই দেখল বিছানা একদম খালি। রাইসা অনেক আগেই উঠে নিচে চলে গেছে। রোদেলা এবার পাশ ফিরে টেবিল ঘড়ির দিকে তাকাল। ঘড়ির দিকে তাকাতেই রোদেলার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সাড়ে সাতটা বেজে গেছে!

—“ইশশ, আজকেও দেরি হয়ে গেল! এই মশাগুলোর জন্য তো রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারলাম না। জানালাটা বন্ধ করে রাখলে হয়তো মশাগুলো এমন উৎপাত করত না।” রোদেলা নিজের মনেই বিড়বিড় করে আফসোস করল।

আরও একটু বিরক্ত হয়ে ভাবল, —“আর ঘোড়ার ডিম রাইসা! ও যে কখন উঠে চলে গেল, একবার ডাকারও প্রয়োজন মনে করল না? হয়তো ডেকেছিল, কিন্তু আমার যে ঘোড়ার ডিমের ঘুম! একবার যদি ঘুমিয়ে পড়ি, তবে দুনিয়া উল্টে গেলেও আমি কিচ্ছুটি টের পাই না। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এত গভীর ঘুম কেন দিলে? চোর-ডাকাত এসে যদি আমার কিডনি, লিভার আর হার্ট সব কেটে নিয়ে হাওয়া হয়ে যায়, তবুও হয়তো আমি টের পাব না। আমার যা ঘুম, অপারেশন করার সময় ডাক্তারদের বোধহয় আর আলাদা করে অ্যানেস্থেসিয়া দিতে হবে না!”

রোদেলা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না । এক লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামল। তাড়াহুড়ো করে ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ও সরাসরি আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। মুখটা একবার আয়নায় ভালো করে দেখে নিয়ে, উস্কোখুস্কো চুলগুলো কোনোমতে টেনেটুনে একটা খোঁপা বাঁধল। এরপর আয়নার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল ও। মনে মনে প্রার্থনা করল, আজ অন্তত মায়ের কাছে যেন বকা শুনতে না হয়।

সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নামতেই রোদেলা দেখল, ডাইনিং টেবিলে সবাই নাস্তা করতে বসে গেছে। অপরাধীর মতো মুখে করে ঝটপট নিজের চেয়ারটার দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে শায়লা বেগম রান্নাঘর থেকে সবজি ভাজির বাটিটা নিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে আসছিলেন। রোদেলা যেই না তাড়াহুড়ো করে নিজের জায়গায় বসতে যাবে, অমনি শায়লা বেগমের সাথে জোরেশোরে একটা ধাক্কা লাগল। ধাক্কার ফলে শায়লা বেগমের হাত থেকে বাটিটা উল্টে সবটুকু গরম ভাজি সরাসরি ঋদ্ধর গায়ের ওপর ছিটকে পড়ল।
ডাইনিং টেবিলের সবাই মুহূর্তেই খাওয়া থামিয়ে থমকে গেল।

শায়লা বেগম আতঙ্কিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, —“একি করলি রোদেলা? দেখে চলতে পারিস না?”

ঋদ্ধ ছিটকে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ঋদ্ধর শার্টের হাতা আর প্যান্টে গরম ভাজি মাখামাখি হয়ে আছে। মুহূর্তের মধ্যে ডাইনিং টেবিল জুড়ে শুরু হলো হুলস্থুল।
মিলি বেগম মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে কপাল চাপড়ালেন। তিনি তাড়াতাড়ি নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে এসে রোদেলার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। ধমক দিয়ে বললেন,

“সবসময় এমন ছটফট কেন করিস? এখন দেখ তো কী একটা বিশ্রী কাণ্ড করে বসলি!”

সুরাইয়া বেগম নিজের ছেলের এই অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলেন। তিনি দ্রুত টেবিলের উপর থেকে টিস্যু নিয়ে ঋদ্ধর দিকে এগিয়ে দিলেন,

“ইসস রে! অনেক গরম ছিল তো ভাজিটা, পুড়ল নাকি হাতটা? যা তো বাবা, চট করে বাথরুমে গিয়ে ধুয়ে ফেল।”

জাহিদ শিকদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোদেলার দিকে এক পলক তাকালেন। সেই চাহনিতেই যেন রাজ্যের বিরক্তি আর গাম্ভীর্য মিশে আছে। পাশে বসা আসাদ শিকদার আর ফারুক শিকদার বিরক্ত মুখে নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করলেন। তাঁদের চাহনিই বলে দিচ্ছিল — রোদেলার কাছ থেকে এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করা বৃথা।
রাইসা আর ঋতু অস্ফুট স্বরে চিৎকার দিয়ে উঠল, ওদের চোখগুলো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেছে। ওদিকে সাদমান মুখ টিপে হাসার চেষ্টা করছে, যেন সে রোদেলার এই বিপদে মজাই পেয়েছে।
সবার মাঝখানে ফারজানা শুধু চুপ করে বসে ছিল। সে আড়চোখে একবার ঋদ্ধর দিকে আর একবার রোদেলার দিকে তাকিয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছে। তার থমথমে মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই ওর মনে কী চলছে।

রোদেলা তখন অপরাধীর মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সবার কড়া চাহনি, আর অন্যদিকে সবার সামনে ঋদ্ধর এই অবস্থা করে ও যেন কথা বলার শক্তিই হারিয়ে ফেলেছে।

ঋদ্ধ নিজের রুমের দিকে চলে যেতেই জাহিদ শিকদার গম্ভীর কণ্ঠে সবাইকে একপ্রকার হুকুম দিয়ে বললেন,

—“এভাবে মূর্তির মতো চুপচাপ বসে না থেকে সবাই তাড়াতাড়ি নাস্তা সেরে নাও।”

জাহিদ শিকদারের কথা শুনে সবাই আবার নাস্তায় মন দিল। রোদেলাও মাথা নিচু করে চুপচাপ খেতে শুরু করল। নাস্তা শেষ করে একে একে সবাই যার যার গন্তব্যে বেরিয়ে গেল। ওদিকে ঋদ্ধ ফ্রেশ হয়ে ওপর থেকে নিচে নেমে এল।

সুরাইয়া বেগম ছেলের কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, —“আয় বাবা, নাস্তাটা করে নে।”

ঋদ্ধ একবার আড়চোখে রোদেলার দিকে তাকাল। তারপর সুরাইয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“না আম্মু, নাস্তা বাইরেই করে নেব । আসছি।”

ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সুরাইয়া বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওদিকে ডাইনিং টেবিল গোছাতে গোছাতে মিলি বেগম রোদেলাকে তাড়া দিলেন,

—“এখনো বসে আছিস? জলদি নাস্তা শেষ কর। সবার খাওয়া হয়ে গেছে, আর তোর খাওয়া শেষ হওয়ার কোন খবর নেই। প্রতিদিন সবার শেষে তোর খাওয়া শেষ হয়। এমন কেন রে তুই? আমার মুখের দিকে তাকিয়ে না থেকে খাবার গুলো গিল। তোর জন্যই টেবিলটাও পরিষ্কার করতে পারছি না।”

রোদেলা এতক্ষণ রুটির টুকরো হাতে নিয়ে চুপচাপ মিলি বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। মিলি বেগমের বকুনি শুনে রোদেলা আর দেরি করল না। দ্রুত নাস্তা শেষ করল। এরপর নিজের রুমে চলে এল।

রুমে ঢুকে দেখল রাইসা বিছানায় হেলান দিয়ে বসে একমনে ফোন টিপছে। রোদেলাকে রুমে ঢুকতে দেখে রাইসা মুখ তুলে বলল,

—“এত সময় কেন লাগে তোর? তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে। আজ যদি তোর জন্য ভার্সিটি যেতে দেরি হয় তবে তোর একদিন কি আর আমার যে- কদিন লাগে জানি না।”

রাইসার কথা শুনে রোদেলা আর পাল্টা জবাব দিল না। চুপচাপ আলমারি থেকে জামাকাপড় বের করে ও দ্রুত বাথরুমের দিকে পা বাড়াল।
তৈরি হওয়ার সময় রোদেলার মাথায় কেবল নাস্তার টেবিলের সেই বিশ্রী ঘটনা আর ঋদ্ধর ওই একপলকের চাহনিই ঘুরছিল। ঋদ্ধর না খেয়ে বেরিয়ে যাওয়াটা ওকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে। তবে রাইসার অনবরত তাগাদায় ভাবনাগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে ও মিনিট দশেকের মধ্যেই তৈরি হয়ে নিল। ব্যাগ হাতে নিয়ে রাইসার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“চল, আমি রেডি।”

এরপর রাইসা আর রোদেলা দুজনে মিলে একসাথে নিচে নেমে এল। বসার ঘরের সোফায় বসে তখন তিন জা মিলে নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন। রাইসা আর রোদেলা তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।
:
:

ভার্সিটিতে পৌঁছে রাইসা আর রোদেলা দেখল প্রতিদিনের মত আজও তিথি তাদের জন্য গেটে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। রাইসা আর রোদেলা তিথির দিকে এগিয়ে গেল। তিথি হাসিমুখে বলল,

—“তোদের জন্যই দাঁড়িয়ে আছি, চল ক্লাসে যাই।”

তিনজনে গল্প করতে করতে ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়াল। তিথি রোদেলাকে ফিসফিস করে বলল,

—“রোদেলা, আজ কিন্তু ইকোনমিক্স ক্লাস। দয়া করে আজ অন্তত একটু শান্তিতে বসে ক্লাস করিস, কোনো অঘটন ঘটাস না!”

ক্লাসে ঢুকে ওরা দেখল, ক্লাসরুম প্রায় কানায় কানায় ভরে গেছে। ক্লাস ভর্তি থাকবেই বা না কেন! আজ যে ঋদ্ধর ক্লাস। ভার্সিটির মেয়েরা এই ক্লাসটা কিছুতেই মিস দিতে চায় না। সবাই বেশ সেজেগুজে পরিপাটি হয়ে বসে আছে, শুধু প্রিয় প্রফেসরকে একপলক দেখবে বলে। রোদেলা একটু জড়সড় হয়ে রাইসা আর তিথির সাথে মাঝামাঝি এক সারিতে গিয়ে বসল।

ঠিক সময়মতো ক্লাসরুমে ঢুকল ঋদ্ধ। সকালের সেই ক্যাজুয়াল শার্ট বদলে এখন সে একদম পরিপাটি ফরমাল লুকে। হাতে লেকচার নোট আর চোখ মুখে সেই পরিচিত গাম্ভীর্য। ক্লাসে ঢুকেই সে একবার পুরো রুমটায় নজর বুলিয়ে নিল। এক মুহূর্তের জন্য তাঁর স্থির দৃষ্টি রোদেলার ওপর থমকে গেল, পরক্ষণেই সে নির্বিকার মুখে নজর সরিয়ে নিল।

ঋদ্ধ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,— “গুড মর্নিং এভরিওয়ান। আজ আমাদের আলোচনার বিষয় Consumer Behaviour।”

বলেই সে লেকচার দেওয়া শুরু করল। ঋদ্ধর লেকচার দেওয়ার ভঙ্গি যেমন চমৎকার, তেমনি তাঁর প্রতিটি শব্দে এক ধরণের গাম্ভীর্য মিশে থাকে। ক্লাসের অন্য মেয়েরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু রোদেলার অবস্থা শোচনীয়। নোটবুক খুলে কলম হাতে ধরে আছে ঠিকই, কিন্তু তার মাথায় ঘুরছে ডাইনিং টেবিলের সেই অপ্রীতিকর ঘটনা আর ঋদ্ধর শান্ত অথচ ধারালো চাহনি।

ঋদ্ধর গম্ভীর কণ্ঠস্বর রোদেলার কানে প্রতিধ্বনি হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ও কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল, ঋদ্ধ যেন লেকচারের ফাঁকে আড়চোখে ওর অস্বস্তিটা পরখ করে নিচ্ছে। রোদেলার কাছে মনে হলো, আজকের এই এক ঘণ্টার ক্লাস যেন কোনোদিনই শেষ হবে না।

অবশেষে ক্লাসের সময় শেষ হলো। ঋদ্ধ নির্বিকার মুখে বললেন, —“আজ এ পর্যন্তই। আগামী ক্লাসে আমরা বাকি অংশ আলোচনা করব।”

ঋদ্ধ ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর রোদেলা একটা লম্বা শ্বাস ফেলল। এতক্ষণে যেন ও বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছে। রাইসা রোদেলার কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,

—“চল, এবার বাইরে যাই। অনেকক্ষণ তো মাথা নিচু করে ছিলি, এবার একটু খোলা বাতাসে গিয়ে বসি চল।”

তিনজনে মিলে ক্যাম্পাসের সেই বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে গিয়ে বসল। দুপুরের কড়া রোদে পিচঢালা রাস্তাটা যেন খাঁ খাঁ করছে। তপ্ত পিচ থেকে একটা গরম ভাপ উঠে চারপাশটা আরও অসহ্য করে তুলেছে। চারপাশে বাতাসের ছিটেফোঁটাও নেই, গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। এই প্রচণ্ড গরমে মাথার ওপরের কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো যেন আগুনের মতো টকটকে লাল হয়ে ফুটে আছে।

রাইসা ওড়নার দিয়ে নিজেকে বাতাস করতে করতে বলল, —“উফ, যা গরম! এখানে এক মুহূর্ত বসে থাকাও দায়।”

তিথি কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই আট-নয় বছরের একটা পিচ্চি ছেলে হন্তদন্ত হয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। ছেলেটার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে, হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ। সে সরাসরি রোদেলার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

—“আপা, এইটা লন।”

রোদেলা অবাক হয়ে ছেলেটার দিকে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

—“এটা কী? কে দিয়েছে?”

ছেলেটা মাথা চুলকে একটু ইতস্তত করে জবাব দিল, —“আমি চিনি না। এক ভাই আপনারে দিতে কইছে। নেন, ধরেন।”

বলেই সে চিঠিটা প্রায় জোর করেই রোদেলার হাতে ধরিয়ে দিল। রোদেলা কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই ছেলেটা উল্টো ঘুরে দৌড়ে চলে গেল। রোদেলা হাতের সেই ভাঁজ করা কাগজটার দিকে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। পিচ্চি ছেলেটা চোখের আড়াল হতেই তিথি রোদেলার হাতের চিঠিটার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। তারপর একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,

—“আচ্ছা রোদেলা, এই চিঠিগুলো তোকে আসলে কে দিচ্ছে রে? প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে ঠিকই তোর কাছে একটা করে চিঠি চলে আসছে!”

রাইসা ব্রু কুঁচকে রোদেলার হাতের চিঠিটার দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকাল। ও কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
—“এই আপদটা আবার কোত্থেকে এল? প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে তোর হাতে এই চিঠিগুলো কীভাবে পৌঁছায় বল তো!”

তিথিও ভ্রু কুঁচকে পাশ থেকে বলল, —“ব্যাপারটা কিন্তু এখন আর মোটেও স্বাভাবিক ঠেকছে না। এই তো সেদিন তোর ব্যাগের ভেতর একটা চিঠি পাওয়া গেল, তার পরদিন এমন পিচ্চি এক বাচ্চাকে দিয়ে পাঠিয়েছিল। আবার ক্যাফেটেরিয়ায় যাওয়ার সময় ওভাবে ফোনে মেসেজ দিয়ে বসল — আর আজকে ও তো পিচ্চি এক ছেলেকে দিয়ে চিঠি পাঠিয়ে তোর হাতে ধরিয়ে দিল!”

তিথি এবার রোদেলার হাতের কাগজটার দিকে তাকিয়ে বলল, —“আচ্ছা ঠিক আছে, এখন চিঠি খুলে পড়া শুরু কর তো! চিঠিতে কী লেখা আছে?”

রোদেলা খানিকটা অনিচ্ছা নিয়ে বলল, —“আহা, বাদ দে না! বাসায় গিয়ে পড়ে নেব।”

তিথি এবার বেশ জোর দিয়ে বলল, “বাসায় গিয়ে পড়বি মানে? আমি কি তোর বাসায় থাকব নাকি? এখন আমি এখানে আছি, চুপচাপ চিঠিটা পড়তে শুরু কর। আমি শুনি কী লেখা আছে।”

রোদেলা বিরক্তি নিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে ভাঁজ করা কাগজটা খুলল। রাইসা পাশ থেকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে।

মাই ডিয়ার
সানফ্লাওয়ার,

তপ্ত দুপুরের এই কাঠফাঁটা রোদও আজ তোমার স্নিগ্ধতার কাছে হার মেনেছে। এই রোদে কৃষ্ণচূড়ার নিচে তোমাকে যখন দেখছিলাম, মনে হচ্ছিল চারদিকের এই তপ্ত গরমে তুমি এক চিলতে শীতল ছায়া।
মেরুন রঙের এই ড্রেসটাতে তোমাকে আজ বড্ড মায়াবী লাগছে, আমার তো চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়েছে। জানো তো সানফ্লাওয়ার, আজ এই রোদে পুড়েও শুধু তোমার দিকেই তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল। ইচ্ছে করছিল সামনে গিয়ে দাঁড়াই, কিন্তু ওই যে—মুগ্ধতা দূর থেকেই বেশি সুন্দর। শুধু জেনে রেখো, এই ভিড়ের মাঝেও আমার তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো সারাক্ষণ শুধু তোমাকেই খুঁজে ফেরে।

ভালো থেকো।

ইতি,

তোমার কেউ একজন..

চিঠিটা পড়া শেষ করে রোদেলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুকটা কেমন জানি দুরুদুরু করছে। একবার আড়চোখে চারপাশে নজর বুলিয়ে নিল। ঠিক তখনই তিথি বলে উঠল,

—“আরে! মেরুন রঙের ড্রেস তো আজ রাইসাও পরেছে!” এই বলে সে খিলখিল করে হেসে উঠল।

রাইসা চরম বিরক্ত হয়ে রোদেলার হাত শক্ত করে টেনে ধরল। তিথির দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলল,

—“হয়েছে, অনেক তামাশা হয়েছে! এবার থাম। এভাবে ৩২টা দাঁত বের করে না হেসে জলদি ওঠ। আমাদের এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে, এই ক্লাসটা কোনোভাবেই মিস দেওয়া যাবে না। তাড়াতাড়ি চল!”

রাইসা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, ওদের রেখেই
ক্লাসের দিকে হাঁটতে শুরু করল। রোদেলা আর তিথিও ওর পিছু পিছু যেতে লাগল।

এক ঘণ্টা পর…..

ঘণ্টাখানেক পর ক্লাস শেষ হলে ওরা তিনজন কথা বলতে বলতে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে এল। তিথি হঠাৎ বলল,

—“চল, ফুচকা খাই।” রাইসা সায় দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, চল যাই।”

রাইসা আর তিথি ফুচকা খাওয়ার জন্য পা বাড়ালেও রোদেলার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। ও তখনো সেই চিঠির কথা ভাবছিল। ওর মাথায় শুধু ঘুরছে — একটা মানুষ কতটা ভালোবাসলে এতটা আবেগ দিয়ে এমনভাবে চিঠি লিখতে পারে!

হঠাৎ রোদেলার সামনে একটা ছেলে এসে দাঁড়াল। আচমকা কাউকে সামনে দেখে ও দু'কদম পিছিয়ে গেল। বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে ছেলেটার দিকে তাকাতেই দেখল, ছেলেটার হাতে একটা লাল গোলাপ। সে হাত বাড়িয়ে গোলাপটা রোদেলার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

—“আমি তোমাকে অনেকদিন ধরে পছন্দ করি, কিন্তু কখনো বলার সাহস পাইনি। প্রতিদিন আমি তোমাকে হারানোর ভয়ে থাকি। তাই আজ এক বুক সাহস নিয়ে নিজের মনের কথাটা বলতে এসেছি। আমি তোমাকে ভালোবাসি, ভীষণ ভালোবাসি। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না রাইসা!”

ভালোবাসি' শব্দটা শুনেই রোদেলার মনের ভেতর যেন রঙিন প্রজাপতিরা ডানা মেলতে শুরু করল। ও ভাবল, বাব্বাহ আজ দেখি লটারি লেগে গেছে! প্রথমে চিঠি, আর এখন সরাসরি প্রস্তাব। কিন্তু শেষ মুহূর্তে 'রাইসা' নামটা শুনেই রোদেলার মুখটা ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেল। হৃদয়ের অন্তঃস্থলে যে প্রজাপতিরা উড়ছিল, তা এক নিমিষেই থেমে গেল।

কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তিথি আর রাইসা দুজনেই হাসতে লাগল। রোদেলা রাগে ছেলেটির হাতের গোলাপটা কেড়ে নিয়ে মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিল। বিরক্ত হয়ে বলল,

—“বেয়াক্কাল লোক! রাইসা আর রোদেলাকে চেনে না, আসছে ঘোড়ার ডিমের প্রপোজ করতে!”

কথাগুলো বলেই রোদেলা হনহন করে সেখান থেকে চলে গেল। তিথি আর রাইসা হাসতে হাসতে রোদেলার পিছু পিছু এল। তিথি মজা করে বলল,

—“কিরে, আজকে কেমন লাগল? শেষ পর্যন্ত আজও ছ্যাঁকা খেয়ে ব্যাকা হয়ে গেলি!”

রাইসাও তিথির সাথে তাল মিলিয়ে হাসতে লাগল।

রোদেলা ভীষণ বিরক্ত হলো। আসলে যখনই কেউ ওকে প্রপোজ করতে আসে, দেখা যায় সেই প্রপোজটা থাকে আসলে রাইসার জন্য। ওরা যমজ বোন হওয়ায় সহজে কেউ ওদের আলাদা করতে পারে না। রাইসার কপালের ডান পাশে একটা তিল আছে, যা দেখে চেনা যায় কে রাইসা আর কে রোদেলা। আর এই তিল না দেখেই সবাই ভুল করে রাইসা ভেবে রোদেলাকে প্রপোজ করে বসে।

পুরো রাস্তা জুড়ে তিথি আর রাইসা রোদেলাকে নিয়ে মজা করল। রোদেলা চুপচাপ সব সহ্য করল, কারণ ও এসবে এখন অভ্যস্ত। বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ওদের বিকেল পাঁচটা বেজে গেল।

চলবে_________

[ আজকের পর্ব কিন্তু ৩০০০+ শব্দ। পর্বটা আপনাদের কেমন লেগেছে কমেন্টে জানাবেন আর রিঅ্যাক্ট দিতে ভুলবেন না। ভুলগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]

Want your public figure to be the top-listed Public Figure in Gazipur?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Website

Address

Gazipur