গল্পের খাতা
জীবনের স্রোতে ভেসে থাকা কথা গুলি গল্প হয়ে উঠে আসে আমার কলমে
11/03/2026
মিসেস সেনগুপ্তার জন্য আজ একটা বিশেষ দিন। আজ ওনাকে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা নিযুক্ত করা হবে এবং সেই অনুষ্ঠানে এলাকার এমএলএ এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন। সেই জন্য উনি সুস্থ পরিবেশের উপরে একখানা লেখনি তৈরি করেছেন যেটা উনি ওনার বক্তব্যে বলবেন। আজ তাই খুব তাড়া ।
ব্যক্তিগত জীবনে ও মিসেস সেনগুপ্তা খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং গোছানো। বাড়িতে তিন তিন খানা হাউস হেলপার রাখা আছে যারা ওনার বাড়িকে সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে সাহায্য করে। বেরোবার আগে মালতিকে বলে দিলেন যে ময়লার প্যাকেটটা যাবার সময় নিয়ে যাবি যেতে যেতে রাস্তায় কোন ফাঁকা জায়গা দেখে ফেলে দিবি। বলেই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে উনি উনার গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর জন্য দামি গাড়িতে চড়ে বসলেন। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব ৬ কিলোমিটারের। আজ সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা ছিলো , বৃষ্টি নামলো এখন।
বৃষ্টি নামতেই রাস্তায় জ্যাম। একটানা বৃষ্টিতে পনেরো কুড়ি মিনিটের মধ্যেই রাস্তায় জল জমে গেল।চারপাশে নর্দমা ভেসে উঠছে রাস্তার ওপর।
গাড়ির ভেতরে দামি শাড়ি পরে বসে থাকা মিসেস সেনগুপ্ত বিড়বিড় করে বলতে থাকলেন।।
Disgusting!! poor people never know how to maintain their surroundings .
18/12/2025
"সংঘাত "
#ঊষসি মজুমদার
এই গল্পের যে মূল নায়ক তার নাম রাতুল। ১৭ বছরের এক নব্যযুবক সে। প্রতিবছরই লাখ লাখ ছেলে মেয়ে স্কুল ফাইনাল পেরিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে কলেজে এডমিশন নিয়ে থাকে। রাতুলও স্বপ্ন দেখেছিল ,তার ভবিষ্যতের। রাতুল , কাকলী ও অনির্বাণের দ্বিতীয় সন্তান। বড় ভাই রাহুল খড়গপুর আইআইটিতে কম্পিউটার সায়েন্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। কাকলি ও অনির্বাণ দুজনেই নর্থবেঙ্গলের একটি কলেজের কেমিস্ট্রির প্রফেসর। বাবা মা ভাই সবাই সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড হওয়া সত্ত্বেও রাতুল ভালোবেসেই কমার্স নেয় । কমার্স তার প্রিয় সাবজেক্ট। পড়াশোনা ছাড়াও খুব ভালো গিটার বাজায় ও গান করে রাতুল। তার বেশ নাম ছিল স্কুলে। বাড়ির সবার অমতে গিয়েই রাতুল কমার্স নিয়েছিল। স্বপ্ন ছিল কলকাতায় এসে কলেজে পড়ার আর অবশ্যই পরে সি এ হওয়ার।
উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তার প্রথম স্বপ্ন সত্যি হয়। কলকাতার একটি কলেজে এডমিশন নেয় সে।
কাকলি ও অনির্বাণ দুজনেই এসেছিল কলকাতায় তাদের ছেলেকে কলেজে এডমিশন এবং থাকার ব্যবস্থা করে দিতে। দুর্গাপুরের সৌমিকের সাথে কলেজে এডমিশনের সময়ই আলাপ হয় রাতুলের সেই আলাপ বন্ধুত্বে পরিণত হয়। দুজনের পরিবারের মধ্যেও বেশ সহৃদ্যতা গড়ে ওঠে।
অবশেষে দুই পরিবারের সম্মতিতে কলেজের কাছেই একটি বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয় সৌমিক এবং রাতুলের জন্য। কলেজ থেকে হাঁটা পথ । তিনতলা বাড়ি । বাড়ির মালিক সুধাময় ব্যানার্জি একটি বেসরকারি ব্যাংকের ম্যানেজার। তিন তলা বাড়ির একতলায় একটি অফিস কে ভাড়া দেওয়া আছে। দোতালায় সুধাময় ব্যানার্জি তার স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে থাকেন । তিন তলার উপরে একটি বড় ঘর একপাশে একটুখানি রান্নার জায়গা আর বাথরুম । সেই ঘরটাই ভাড়া নেওয়া হয় রাতুল আর সৌমিকের জন্য। কাকলির একটু আপত্তি ছিল ছাদের উপরে গরম লাগবে বলে; বাড়ির মালিক বলেন, যে উনি এসি লাগিয়ে দেবেন। রাতুলের আবার বাড়িখানা খুব পছন্দ হয় । বেশ নিজের মতো করে থাকা যাবে। নিচ থেকে একখানা মাধবীলতার গাছ পুরো ছাদ অব্দি উঠে এসেছে। পুরো গাছটাই এখন ফুলে ভরা। বাড়ির সৌন্দর্য বাড়িয়ে রেখেছে এই গাছখানা। ছাদখানা ও বেশ সুন্দর। টবের মধ্যে অনেক ফুলের গাছ। মালিকের ঘরে যে দিদি কাজ করেন সেই দিদিকেই রাতুল আর সৌমিকের ঘর মোছা ও কাপড় কাচার দায়িত্ব দেওয়া হল। কাছের একটি হোম ডেলিভারি থেকে ওদের খাবারেরও ব্যবস্থা করা হলো। রাতের খাবার হোম ডেলিভারি থেকে আসবে। সকাল আর দুপুরে কলেজের ক্যান্টিনে খেয়ে নেবে। মোটামুটি ব্যবস্থা করে কাকলি অনির্বাণ নিজের জায়গায় ফিরে গেল। সৌমিকের বাবা সৌরভ দত্ত ব্যবসায়ী মানুষ তিনিও তার ছেলেকে কলেজে ভর্তি করে এবং রাতুলের সাথে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে দুর্গাপুরে ফিরে গেলেন। ছেলেকে রেখে যাওয়ার সময় যথারীতি কাকলির দুই চোখ ভিজে উঠল। কাকলি আর অনির্বাণ দুজনই নর্থ বেঙ্গলে ফিরে গেল।
এই প্রথমে রাতুল একা বাবা মাকে ছেড়ে থাকতে এসেছে। সৌমিকের মাধ্যমিকের আগেই তার মা মারা যান । সে গত দু'বছর থেকে কলকাতায় পিসির বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেছে। তাই সে কলকাতার অনেক কিছুই চেনে। এখন সৌমিকের পিসির শরীর ভালো নেই তাই সৌরভ বাবু ছেলেকে পিজিতে রাখার ব্যবস্থা করেন।
সবকিছু ভালোভাবে শুরু হয়। সৌমিকের পুরনো স্কুলের দু'চারটি ছেলে-মেয়েও এই কলেজে এডমিশন নিয়েছে। রাতুলেরও তাদের সাথে বন্ধুত্ব হয়। কলেজের নবীন বরণ উৎসব হয় ।সেই উৎসবে রাতুল অংশগ্রহণ করে এবং সেই অনুষ্ঠানে সে বেশ ভালোই পরিচিতি লাভ করে। গিটারের সুরে তার গানের গলা সবার মন কেড়ে নেয়।
শুরুর দিকে কলেজে দিনগুলি খুব ভালোই কাটতে থাকে। দিয়া , নীতি, পল্লব, চিন্ময় ,সৌমিক আর রাতুলের একটা গ্রুপ তৈরি হয়। দিয়া আর পল্লব সৌমিকের পুরনো স্কুলের বন্ধু। নীতি আর চিন্ময়ের সাথে তাদের এই কলেজে এসে আলাপ হয়েছে। দিয়া চুঁচুড়ার মেয়ে।
নীতি ধানবাদের, তাই সে একটা পিজিতে থাকছে। চিন্ময় গড়িয়া তে তার নিজের বাড়িতেই থাকে। আর পল্লবের বাড়ি শ্যাম বাজারে।
কলেজের ফাঁকে সবাই মিলে একসাথে ক্যান্টিনে আড্ডা দেওয়া ,ক্যাম্পাসে বসে গান করা সবমিলিয়ে বেশ ভালোই দিন কাটতে থাকে তাদের।
বয়সের সন্ধিক্ষণে নতুন উৎসাহ আবেগ আর কৌতুহল থাকে সবার মধ্যেই। রাতুল আর সৌমিকও এর ব্যতিক্রমী ছিল না।
রাতুলের চাইতে সৌমিক কিছুটা এডভান্স ছিল। সব বিষয়েই এই যেমন সিগারেট খাওয়া অল্পস্বল্প মদ্যপান তার সঙ্গে অ্যাডাল্ট মুভি দেখা সব বিদ্যাই ধীরে ধীরে সৌমিকের থেকে রাতুল নিতে থাকে। একটা কথা আছে সঙ্গ দোষ বড় দোষ। যৌবনের আনন্দ নিতে স্ব মৈথুন কি করে করতে হয় সেটাও সে প্রথম শেখে সৌমিকের কাছ থেকে।
এই সব কিছুই খুব সাধারণ জিনিস। এর মধ্যে কিছু এবনরমালিটি নেই।
এরই মধ্যে রবিবার দিন সব বন্ধুরা মিলে অ্যাক্সিস মল বেড়াতে গেল, সেখানে মুভি দেখে একসাথে খাওয়া দাওয়া করে যে যার বাসস্থানে ফিরে এলো।
নবীন বরণ উৎসবের, দিন থেকেই নীতির ভালো লেগেছিল রাতুলকে। স্পেশালি রাতুলের গানের গলা সবাই বলে, সে নাকি অরিজিৎ সিং এর ডুপ্লিকেট।
এবারে ইকো পার্কে বেড়াতে এসে দিয়া সৌমিককে বলে যে নীতির রাতুলকে ভালো লেগেছে। সে রাতুলের সাথে রিলেশনশিপে যেতে চায়। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই নীতির সেই বার্তা দিয়ার কাছ থেকে সৌমিক আর সৌমিকের থেকে রাতুলের কাছে পৌঁছায়। সব বন্ধুরা মিলে একসাথে চিয়ার্স বলে ওঠে।
রাতুলেরও ভালো লাগে নীতিকে। দুজনের সমান-সম্মতিতেই ওরা এই সম্পর্ক কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে।
রাতুলের জীবনে নীতি আসার পর থেকে গান যেন আরো বেশি করে জড়িয়ে ধরে রাতুলকে গানের প্রতিটা লাইন তার মন প্রাণ সব ছুঁয়ে যায় তার মনে হয় ,সব কটা লাইন যেন সে নীতির জন্যই গাইছে।
বাড়ির মালিক সুধাময় ব্যানার্জি ও বেশ ভালো লোক সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় উনার সাথে দেখা হয়, উনি সব সময় ওদের খোঁজখবর নেন । সকালে একবার ছাদে এসে গাছের পরিচর্যা করা তার দৈনন্দিন রুটিন এর মধ্যে পড়ে। তখনো দেখা হলে হেসে কথা বলেন। উনি ওনার কথামতো ওদের ঘরে একখানা দু'টনের এসিও লাগিয়ে দিয়েছেন। রবিবার দিন পুরো দিনটাই হোম ডেলিভারি থেকে খাবার আসে। রান্নার জায়গায় একটা ইন্ডাকশন বসানো হয়েছে এখন মাঝেসাঝে, ওরা ম্যাগি ডিম সেদ্ধ কফি এইসব বানিয়ে খায়। কাজের দিদিও নিয়মিত এসে ওদের ঘর পরিষ্কার ও জামা কাপড় কেচে দিয়ে যায়। দিদির কাছে ওদের ঘরের একখানা চাবি দেওয়া আছে।
এরই মধ্যে কলেজ তিন দিনের জন্য ছুটি হল, শনি রবি মিলিয়ে প্রায় পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া যাবে।কলেজে আসার পর এই প্রথম রাতুল তার বাড়ি গেল। অনির্বাণ অনলাইনে টিকিট কেটে ছেলেকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বন্দে ভারতে এক রাতের মধ্যেই রাতুল বাড়ি পৌঁছে যায়। কাকলির তো আর আনন্দে ধরে না। সৌমিক ও তার বাড়ি দুর্গাপুরে গেল।
কাকলির মনে হল এই কিছুদিনে তার ছেলে যেন তার থেকে অনেকটা দূর হয়ে গেছে। আগে বড্ড মায়ের কাছ ঘেষা ছিল ছেলেটা, এখন সারাক্ষণ কানে ইয়ারফোন গুঁজে হয় গান শুনে, বা ঘুমায়, নয়তো ফোনে কথা বলে। অনির্বাণ কাকলিকে বোঝায় সময়ের সাথে সাথে সন্তানের সাথে দূরত্ব আসবে এটাই স্বাভাবিক।
কলকাতা ফেরার সময় কাকলি অনেক জলখাবার বানিয়ে দিল রাতুলকে ,বলল সবাইকে দিয়ে খাবি।
ছেলেকে ট্রেনে তুলে দিতে এসে আবারো কাকলির চোখ জলে ভরে আসলো।
রাতুল মাকে জড়িয়ে বলল," কাদঁছো কেন ! আমি তো আবার আসবো। "
যত দূর অব্দি দেখা গেল কাকলি তাকিয়ে থাকলো তার ছেলের দিকে, ট্রেন চলে যাওয়ার দিকে।
সেদিন রাতে সৌমিকও ফিরে আসলো দুর্গাপুর থেকে পরদিন মানে সোমবার থেকে তাদের ক্লাস।
ক্লাসে গিয়ে সব বন্ধুদের সাথে দেখা হল টিফিন ব্রেকে রাতুল তার মায়ের বানানো সব খাবার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করলো। এই ছুটিতে নীতি বাড়ি যায়নি নীতির বাবা-মা এসেছিলেন তার কাছে সে মা-বাবার সাথে পুরী গিয়েছিল বেড়াতে। সেও পুরী থেকে নিয়ে আসা প্রসাদ সব বন্ধুদের দিলো।
নেক্সট উইকে তাদের প্রথম পরীক্ষা।পরীক্ষার আগে তিন দিন স্টাডি লিভ আছে। সবাই মিলেই ঠিক করল যে এখন ওরা আর বেশি আড্ডা দেবে না, বা ফোনেও বেশিক্ষণ কথা বলবে না। এখন সবাই মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। পরীক্ষার পর আবার সবাই মিলে একদিন একসাথে আড্ডা দেওয়া হবে।
রাতুল বরাবরেরই ভালো ছাত্র। সৌমিক ও মোটামুটি ভালোই পড়াশোনায়। দুজনেই রাত জেগে একসাথে পড়াশোনা করে। মাঝে মাঝে কফি বানিয়ে খায়।
দেখতে দেখতে তাদের পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেল।
সামনের সপ্তাহেই সরস্বতী পুজো । সবাই মিলে ঠিক হল যে একটা হ্যাংআউট করা হবে। নীতি ,দিয়া ,চিন্ময়, পল্লব সবাই আসবে রাতুল আর সৌমিকের ঘরে। জমাটো থেকে খাবার অর্ডার দেওয়া হবে। আর থাকবে ড্রিংকস এর ব্যবস্থাও। পল্লবের মামার ওয়াইন শপ আছে, তাই পল্লবই সব ব্যবস্থা করবে। সকালবেলা সবাই প্রথমে কলেজে আসবে সেখান থেকেই রাতুলদের ওখানে যাওয়া হবে। সুধাময় ব্যানার্জি ও স্ত্রী পুত্র সমেত ভেলোরে গেছেন চেকআপ করাতে। বাড়ি পুরো ফাঁকা। কাজের দিদিও দুপুর তিনটের মধ্যে কাজ সেরে বাড়ি চলে যান। অতএব তারা সবাই একসাথে মিলে আনন্দ করতে পারবে।
সরস্বতী পূজার দিন সকাল সকাল চান করে পাঞ্জাবি পরে রাতুল ও সৌমিক কলেজ যায় ।সেদিন নীতিও একখানা হলুদ জামদানি পরে কলেজে আসে। রাতুল প্রথম নীতিকে শাড়িতে দেখলো । ওদের কলেজে ইউনিফর্ম আছে, ছেলেরা শার্ট প্যান্ট আর মেয়েরা চুড়িদার। এছাড়াও যখনই বাইরে গেছে, নীতিকে জিন্স এবং টপ পড়তেই দেখেছে। আজ হলুদ জামদানির সাথে একখানা লাল রঙের ডিপ নেক ব্লাউজ পড়েছে নীতি। নীতির গায়ের রং যে এত ফর্সা আজ তা বুঝতে পারল। রাতুল। তার ফর্সা গায়ের রং উপচে পড়ছে । নীতির গলার সোনার চেনে N আলফাবেট লকেট খানা ঠিক তার বুকের মাঝখান থেকে উঁকি মারছিলো। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের মধ্যে ছোট্ট খয়েরী টিপ, কানে সোনালী ঝুমকা চোঁখে ঘন কাজল আর ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। আজ যেনো রাতুল চোখ ফেরাতে পারছিলো না। সবার চোখের আড়ালে সে বারবার নীতিকে দেখছিল।
সাদা পাঞ্জাবিতে পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চ লম্বা মাঝারি গায়ের রং কোঁকড়া চুলের রাতুলকেও আজ খুব ভালো দেখাচ্ছিলো ।পুজোর শেষে অঞ্জলি দেওয়া ও প্রসাদ নেওয়ার পর ওরা সবাই মিলে ছবি তুলতে থাকে।
সৌমিক বলে কিরে রাতুল তোরা একটা একসাথে ছবি ছবি তোল। নীতি ও হেসে রাতুলের পাশে এসে দাঁড়ায়। সামনে থেকে পল্লব, চেঁচিয়ে ওঠে,
কিরে তোরা কি ভাসুর আর ছোট ভাইয়ের বউ নাকি এত দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? একটু কাছে আয় দুজনে ,একটা ভালো করে ছবি তুলে দেই তোদের।
শুধু যেন এই কথা টুকুর অপেক্ষায় ছিল রাতুল। পল্লবের বলার সঙ্গে সঙ্গে নীতির কোমর জড়িয়ে ওকে কাছে টেনে নেয় রাতুল। নীতির গায়ের মিষ্টি সুবাসে রাতুলের যেনো নেশা হতে থাকে। নীতিও চমকে আর ভালোলাগায় ভেসে যেতে থাকে।ছবি পর্ব শেষ করে একসাথে সবাই মিলে রাতুল আর সৌমিকের ঘরে আসলো ওরা।
আসরের শুরুতেই সবাই রাতুলের গান শুনতে চাইলো। রাতুলও যেনো আজ গান গাওয়ার জন্য ব্যাকুল , সে (সাগর মুভির গান )
"চেহরা হে য়া চাঁদ খিলা হে জুলফ্ ঘনেরি শাম হে কিয়া সাগর জায়সি আঁখে ওয়ালি য়ে তো বাতা তেরা নাম হে কিয়া,, "
সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠলো নীতি ওর কিয়া! সবাই একসাথে হেসে উঠলো। গানে গল্পে আড্ডায় ওদের আসর জমে উঠলো। পল্লব ওর নিয়ে আসা সেই (জাদুইয়ী পানি )বের করলো ওর ব্যাগ থেকে। স্টিলের গ্লাস বাটি সব মিলিয়ে পাঁচ খানা জোগাড় হলো ওরা ছয় জন ,চিন্ময় বললো আরে চিন্তা কিসের রাতুল আর নীতি একটা থেকে খেয়ে নেবে। অনলাইনে অর্ডার করা খাবার ও এসে গেছে ততক্ষনে। সবাই একসাথে মিলে খানা পিনা চলতে থাকলো। সৌমিক মুভি দেখার প্রস্তাব দিলো। দিয়া আর নীতি দুজনেই একসাথে বাধা দিয়ে উঠলো।
বললো,ওই সব মুভি তোমরা ছেলেরা ছেলেরা দেখো আমাদের সামনে দেখতে হবে না । সৌমিক ও আর কিছু বললো না। আলেক্সা তে গান বাজছে এখন।
অনেক্ষন আড্ডা দেবার পর এবার যে যার আস্তানায় ফেরার পালা। পল্লব বললো ,সে দিয়া কে স্টেশনে পৌঁছে দেবে। বলে ওরা বেরিয়ে গেলো। নীতি আর রাতুল আরও একটু সময় কাছাকাছি থাকতে চাইছে। চিন্ময় ও উঠে পড়লো এবারে । সৌমিক বললো, আমাকে তো একটু পিসির বাড়ি যেতে হবে পিসি পুজো করছে । যেতে বলেছে আমাকে। আমি আসছি ।তোরা লাভ বার্ড আরো কিছুক্ষন একসাথে থাক। বলে সৌমিক আর চিন্ময় বেড়িয়ে গেলো একসাথে।
এখন এই ঘরে শুধুমাত্র নীতি আর রাতুল। আলেক্সা তে গান বাজছে
"এতো কাছে দুজনে প্রেম ভরা যৌবনে,,,""।
প্রেমিক যুগল আরো ঘনিষ্ঠ হয় এবারে। রাতুলের ঠোঁট দুটো নীতির ঠোঁট কে স্পর্শ করে। এক ঝটকায় নীতি দূরে সরে যায়। ইচ্ছে লজ্জা বাঁধা সব কিছু যেনো একসাথে কাজ করে নীতির মধ্যে ।রাতুল তখন মরিয়া , পেটে কিছু তরল পদার্থও গেছে । তার উপর আবার নীতি আজ শাড়ি পড়ার দরুন তার পেট বুক কোমর সব উন্মুক্ত। রাতুল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না । সে রিকোয়েস্ট করতে থাকে নীতি কে । প্লিজ প্লিজ বলে।
নীতি বাঁধা দিলে রাতুল আরও বেশি উগ্র হয়ে ওঠে সে এবারে নীতির উপরে জোড় খাটাতে যায় ।
এবারে চিৎকার করে উঠে নীতি ,সে রেগে গিয়ে বলে তোর মনে এরকম খারাপ অভিসন্ধি ছিলো সেটা আমার জানা ছিলো না।
রাতুল যেনো আজ কোনো বাঁধাই মানবে না । সে বলে,
কিন্তু তুই তো আমাকে ভালোবাসিস ! আমি ও তোকে ভালোবাসি।
নীতি বলে তাই বলে এসব ঠিক নয় , কিস করেছিস সেই অব্দি ঠিক আছে। কিন্তু তুই যেটা চাইছিস সেটা এই মুহুর্তে আমাদের জন্য ঠিক নয় ।আমরা এখনো এই সবের জন্য অনেক ছোটো।
রাতুল তখনো মরিয়া ,সে বলে কিচ্ছু হবে না ,নীতি
শুধু একবার প্লিজ তুই রাজি হয়ে যা।
নীতি ছিটকে সরে যেতে যেতে বলে, আমি সবাইকে বলে দেবো তোর কথা । তুই আমাকে জোর করিস না ।বলতে বলতে খাটের উপর থেকে নিজের ব্যাগ খানা উঠিয়ে শাড়ির আঁচল সামলে সে ঘর থেকে এক ছুটে বেরিয়ে যায়।
সবাইকে বলে দেবো কথাটাতে ভয় পেয়ে যায় রাতুল। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে থাকে।
নীতি বেরিয়ে এসে সোজা একটা রিক্সায় চেপে বসে নিজের পিজির ঠিকানা বলে। রাগে দুঃখে তার শরীর কাপছে তখনও।
পিজি তে ফিরে দেখে মহুয়া দি তার রুম মেট এখনো ফেরে নি। একই গ্লাস থেকে ও আর রাতুল খাচ্ছিলো বলে ওর বেশি খাওয়া হয় নি। রাতুল তো এর আগে কোনদিন এরকম করেনি। তবে কি এসব তরল পানীয় পেটে যাবার ফল । আর সৌমিকই বা তখন চলে গেলো কেনো! সে আগে তো বলেনি যে ,সে তার পিসির বাড়ি যাবে।
নীতি ভাবে তারই দোষ হয়েছে । দিয়ার সাথে বেড়িয়ে যাওয়া উচিৎ ছিলো। তখন বেরিয়ে আসলে এই ঘটনাটা ঘটতো না হয়তো।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে এই সব ভাবতে ভাবতে কখন তার চোখে ঘুম নেমে আসে কে জানে। রাত তখন ন'টা। মহুয়া দি ফিরে এসে ঘরে আলো জ্বালিয়েছে বলছে কি রে ,
নীতি অন্ধকারে শুয়ে আছিস কেনো।মাথা ধরেছে বুঝি?
নীতি ধড়মড় করে উঠে বসে বিছানায়। সে ওই শাড়ি পড়া অবস্থাতেই এসে শুয়ে পড়েছিলো। বললো না না ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । মোবাইল সুইচ অফ করে দিয়েছিলো নীতি রাগ করে। ভেবেছিল,রাতুল হয়তো ফোন করে বিরক্ত করবে।
অন করে দেখলো যে না রাতুলের একটাও মিস কল নেই। কিন্তু দিয়ার পাঁচটা সৌমিকের দশটা আর পল্লব চিন্ময়ের ও চার পাঁচটা করে মিস কল। অবাক লাগে নীতির । এই ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে এতো গুলো ফোন।
সে সবার আগে দিয়া কে কল ব্যাক করে ।
দিয়া ফোন ধরেই হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে এই নীতি কোথায় ছিলি ফোন ধরছিলি না কেনো । কি হয়েছিলো তোদের মধ্যে তুই কখন ফিরেছিস সৌমিক ফোন করেছিলো ,রাতুল গলায় দড়ি দিয়েছে।এক শ্বাসে কথা গুলি বলে দিয়া। দিয়ার শেষ কথায় বাকরুদ্ধ হয়ে যায় নীতির। নীতিকে ওই অবস্থায় দেখে মহুয়া এসে সামনে দাঁড়ায় নীতির ।
কি হয়েছে রে নীতি? ওরকম করছিস কেনো। আমাকে বল কি হয়েছে। ফোনে তখনো দিয়া চিৎকার করে যাচ্ছে , দিয়ার কাছ থেকে সব শুনে মহুয়া বলে, চল আমি যাচ্ছি তোর সাথে।
পিজিতে কথা বলে ওরা যখন রাতুলের বাড়ীতে পৌঁছায় তখন ঘড়িতে প্রায় পৌনে দশটা বাজে। সুধাময় ব্যানার্জির বাড়ির সামনে তখন অনেক ভিড় ।পুলিশের গাড়ি ও দাড়িয়ে আছে নীচে । দিয়া বিশ্বাস করতে পারছে না এখনো যে রাতুল আর বেঁচে নেই। কি কারণে সে এরকম করলো। তবে কি, সে যে বলেছিলো , সবাইকে বলে দেবো এই ভয়ে সে এরকম কাণ্ড করে বসলো। নীতির ভীষণ কষ্ট হচ্ছে , এখন মনে হচ্ছে কথাটা না বললেও পারতো। উপরে গিয়ে জানতে পারলো যে সৌমিক তার পিসির বাড়ি থেকে ফিরে এসে দেখে পুরো ঘর অন্ধকার । দরজা খোলা , আলো জ্বালাতেই চোখে পড়ে রাতুল ফ্যানের সাথে ঝুলছে ।
পুলিশ এসে বডি নীচে নামিয়েছে। সবাই এখন ছাদের মধ্যে ঘরে কাউকে যেতে দিচ্ছে না পুলিশ। চিন্ময় ও এসেছে।
এদিকে নর্থ বেঙ্গলে কাকলি আজ সরস্বতী পুজো করেছে। কয়েকজন কলিগকে নেমন্তন্ন করেছিলো। সকালে একবার রাতুল কে ফোন করে কথা বলেছিলো। সঙ্গে এটাও বলছিলো যে এই প্রথমবার বাড়িতে সরস্বতী পুজোর সময় রাতুল বাড়ি নেই।
(কাকলি এখনো জানে না যে তার ছোটো ছেলে এখন আর এই পৃথিবীতেই নেই।)
বড় ছেলে রাহুল তো গত দু বছর থেকেই বাইরে।
সব কাজ মিটিয়ে সে এবারে তার ছোটো ছেলে রাতুলকে ফোন লাগায়। কিন্তু ফোনের ওপারে যে কি ভয়ানক সত্যি তার জন্য অপেক্ষা করে আছে সে তো কাকলি জানে না।
রাতুলের ফোন এতক্ষণে পুলিশের কব্জায়। পুলিশ ফোন ধরে কাকলি কে তাড়াতাড়ি কলকাতায় আসতে বলে। রাতুলের বডি এতক্ষণে সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে গাড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে তার পোস্টমর্টেম হবে।
কাকলি সব শুনে জ্ঞান হারায়। তার কানে একটা কথাই বাজছে।
" কাদঁছো কেনো ? আমি তো আবার আসবো।"
অনির্বাণ ও খবর পেয়ে স্তব্ধ হয়ে যান। সকালেই কথা হলো ছেলের সাথে এই টুকু সময়ের মধ্যে কি এমন হলো যে তাদের ছেলে এরকম করে বসলো!
পুলিশ একটা সুইসাইড নোট উদ্ধার করে ,যেখানে লেখা আছে
"আমাকে ক্ষমা করে দিও মা ' আমি তোমার ভালো ছেলে হতে পারলাম না ।"
এ ভাবেই একটা প্রাণ অকালে ঝরে গেল। সামনের মাসেই রাতুলের ১৮ বছরের জন্মদিন ছিল।
সব বন্ধুদের জবানবন্দি থেকে জানা গেল শেষ অবধি রাতুলের সাথে নীতি ছিল। নীতি চলে যাওয়ার পরই রাতুল এই সিদ্ধান্ত নেয়।
কাকলি সব কথা জানার পর পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছে যে নীতির জন্যই আজ তার ছেলের এই পরিণতি।
কিন্তু সত্যিই কি তাই ! রাতুলের মৃত্যুর জন্য কি তবে নীতি দায়ী।
**** **** ***** ***** ***
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Website
Address
Pune