Prothoma Prokashan
সারা বছর সেরা বই
27/05/2026
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে বরাবরই একধরনের সংবেদনশীলতা রয়েছে।
এ দেশে সেনাবাহিনী নিয়ে প্রকাশ্যে কখনোই খুব একটা আলোচনা হতে দেখা যায় না; যদিও এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে বেশ খানিকটা কৌতূহল কাজ করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কটি সব সময়ই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। নানা সময়ে ঘটা অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান পেরিয়ে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই সম্পর্ক ভিন্ন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। এ অবস্থা কত দিন স্থায়ী হবে,
এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আমাদের করণীয় কী, সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের রাজনীতিতে কতটুকু সম্পৃক্ত হতে পারে—এসব প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া বিশেষ জরুরি। আর সে জন্য প্রয়োজন রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা। এই বইয়ে তারই কিছু ইঙ্গিত বা পথনির্দেশ পাঠক পেতে পারেন। ১৯৯৬ থেকে ২০১০ কালপর্বে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ঘটা নানা ঘটনা এবং তার সঙ্গে দেশের রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে গ্রন্থভুক্ত লেখাগুলোতে।
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মিশেলে তৈরি এসব লেখা সংবাদপত্রে প্রকাশকালেই অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।
25/05/2026
প্রথমা প্রকাশনের নতুন বই
এলো খুশির ঈদ: নজরুলের ঈদবিষয়ক রচনা সংকলন
কাজী নজরুল ইসলাম, সম্পাদক: খিলখিল কাজী
কাজী নজরুল ইসলাম যখন কবি হিসেবে বেশ খ্যাতিমান, গান রচনায়ও সিদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন, তখনো গান-বাজনার চর্চা জায়েজ কি না তা নিয়ে বাঙালি মুসলমান সমাজের এক বড় অংশের মধ্যে বিতর্ক চালু ছিল। নজরুল এ ক্ষেত্রে যাকে বলে যুগান্তর ঘটিয়েছেন। ইসলাম ধম-সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় এবং ঈদসহ বিভিন্ন উৎসব-পার্বণ নিয়ে একের পর এক গান লিখে, সুর দিয়ে ও রেকর্ড করিয়ে গানকে বাঙালি মুসলমানের প্রাত্যহিক জীবনে অনুষঙ্গে পরিণত করেছেন। এ তথ্য মোটামুটি আমাদের সবার জানা।
নজরুলের লেখা ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি ছাড়া আজও আমাদের ঈদ উৎসব পূর্ণতা পায় না। ঈদ উপলক্ষে লেখা এই গানটিই শুধু নয়—এক ঈদ নিয়েই নজরুল কবিতা, গান, গদ্যরচনা, এমনকি নাটক কত কিছু যে লিখেছেন, আমরা কজন তার খবর রাখি? একটি সংকলন পুস্তকের পরিসরে নজরুলের ঈদ বিষয়ক গদ্য-পদ্য সকল রচনা পাঠকদের উপহার দিতে পেরে আমরা আনন্দিত।
মূল্য: ২৫০ টাকা
৮০ পৃষ্ঠা
প্রথম প্রকাশ: জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, মে ২০২৬
প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল
ISBN: 9789843338891
11/05/2026
শব্দসুরে কবিতাসফর
নিবিড় পর্যবেক্ষণই ভ্রমণকে প্রকৃত অর্থে পর্যটনে রূপ দেয়। অনেকেই দূরদেশে যান, নানান দৃশ্য দেখেন, কিন্তু তা যদি কেবল চোখের দেখা হয়, অনুভবে ধরা না পড়ে, তবে সে ভ্রমণ অপূর্ণই থেকে যায়। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায়: নিজেকে জানা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই জানাকে প্রকাশ করাও সমান প্রয়োজনীয়। বাংলা সাহিত্যে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’ ভ্রমণকাহিনির এক উজ্জ্বল সূচনা। পরবর্তীকালে বহু লেখক ভ্রমণকে শিল্পে রূপ দিয়েছেন। কবি আল মাহমুদ স্বদেশ বাংলার গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে বিস্তৃত জনপদে যেমন নিরন্তর ঘুরে বেড়িয়েছেন, তেমনি পৃথিবীর নানা প্রান্তেও ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছেন। ১৯৮৮ থেকে ২০০২—এই দীর্ঘ সময়ে আল মাহমুদ ভারত, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ভ্রমণ করেন। সেই ভ্রমণের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন কবিতার জন্য বহুদূর, কবিতার জন্য সাত সমুদ্র এবং কবিশিল্পীদের মাতৃভূমি প্যারিস গ্রন্থে। এই তিন ভ্রমণকাহিনি একত্রে সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে তিন শহর তিন আকাশ নামে।
গ্রন্থটির প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই পাঠক অনায়াসে লেখকের সঙ্গী হয়ে প্রবেশ করবেন তাঁর ভ্রমণজগতে। তাঁর সূক্ষ্ম ও মনোযোগী পর্যবেক্ষণে উন্মোচিত হয়েছে সেসব অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বহুমাত্রিক চিত্র।
-------------------------------------------------------------------------
লন্ডন আর প্যারিসের তুলনা করে তিনি লিখেছেন, ‘প্যারিসে গিয়ে এবার শুনেছি সেখানে তরুণ ফরাসি কবিদের জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে ক্রমবর্ধমান। উপন্যাস ও ফিকশনের প্রবল প্রতাপ থাকলেও ফরাসিরা এখনো কবিতা পড়ে এবং কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, যা লন্ডনে সচরাচর দেখা যায় না।
--------------------------------------------------------------------------
‘কবিশিল্পীদের মাতৃভূমি প্যারিস’ অংশে লেখক উল্লেখ করেছেন, প্যারিস না দেখলে ইউরোপের হৃদয়কে স্পর্শ করা সম্ভব নয়। এর আগে যুক্তরাজ্যে মির্জা গালিবের স্মরণোৎসবে একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন আল মাহমুদ। তবে তাঁর মনে হয়েছে, তখন ইউরোপ সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল আংশিক! প্যারিসে এসেই সেই ধারণা পূর্ণতা লাভ করেছে। ফরাসি কবিতা ও প্যারিসের প্রতি ভালোবাসা কৈশোরকাল থেকেই ছিল তাঁর। শার্ল বোদলেয়ার, র্যাঁবো, এলুয়ার, মালার্মে, লা ফর্গ, লুই আঁরাগ প্রমুখ কবির কবিতা পড়ে তিনি ফ্রান্সের প্রতি আগ্রহী হন। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপায়িত হওয়াই আপ্লুত হয়েছেন তিনি।
একজন কবি বলেই কবিতার হালহকিকত, কবিতাচর্চা আল মাহমুদকে উদ্বেলিত করে। লন্ডন আর প্যারিসের তুলনা করে তিনি লিখেছেন, ‘প্যারিসে গিয়ে এবার শুনেছি সেখানে তরুণ ফরাসি কবিদের জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে ক্রমবর্ধমান। উপন্যাস ও ফিকশনের প্রবল প্রতাপ থাকলেও ফরাসিরা এখনো কবিতা পড়ে এবং কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, যা লন্ডনে সচরাচর দেখা যায় না। যদিও ব্রিটিশ কাউন্সিল তরুণ ইংরেজ কবিদের কবিতার বই মাঝেমধ্যে বের করে ইংরেজি কবিতার ধারাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে।’ এ ছাড়া এ গ্রন্থে কবিতাযাত্রার সূত্র ধরেই তাঁর ব্যক্তিগত বিতর্কগুলোর আংশিক ছায়াপাত করেছেন লেখক।
গ্রন্থটির ‘কবিতার জন্য সাত সমুদ্র’ অংশ থেকে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাজ্যের ওল্ডহাম মেট্রোপলিটন ব্যুরো আল মাহমুদকে আমন্ত্রণ জানায়। ২৯ সেপ্টেম্বর, ওল্ডহামের ঐতিহ্যবাহী কুইন এলিজাবেথ হলে অনুষ্ঠিত হয় ‘আন্দাজ-এ-বয়ান ঔর’—আ মাদার টাং কনফারেন্স অ্যান্ড মুশায়েরা। সেদিন আল মাহমুদ প্রথমে আবৃত্তি করেন ‘ভারতবর্ষ’ কবিতাটি, এরপর আরও কিছু কবিতা পাঠ করেন। শেষকৃত কবিতাটি ছিল ‘নোলক’, যার শেষ পঙ্ক্তি ‘আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে’ উচ্চারণ করতেই সারা হল বাঙালি শ্রোতাদের উল্লাসধ্বনিতে কেঁপে ওঠে। উর্দু ও ইংরেজির আধিপত্যের মাঝেও বাংলা ভাষার মাধুর্য ও উচ্ছ্বাস শ্রোতাদের হৃদয় স্পর্শ করে। পাঠকও গ্রন্থটি পাঠ করে আলোকিত ও আলোড়িত হতে পারেন।
‘কবিতার জন্য বহুদূর’ অংশটি উপভোগ্য হয়ে ওঠে নবনীতা দেবসেন ও আল মাহমুদের চিন্তার ভিন্নতা ও অম্লমধুর আলাপচারিতায়। তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। আল মাহমুদ নিরাপদে ভোপাল পৌঁছানোয় নবনীতা খুশি ছিলেন; কিন্তু খানিকটা অনুযোগ করেই বলেন, ‘ধার্মিক হওয়া ভালো, তবে মৌলবাদী হওয়া ভালো নয়।’ এর জবাবে আল মাহমুদ জানান, ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো পরিত্যাগ করে কেউ সত্যিকার ধার্মিক হতে পারে না। তাঁদের এই সংলাপ তাদের ভাবনাচিন্তা ও আত্মবিশ্বাসের গভীরতার পরিচয় দেয়। গদ্যের কারুকাজে নিজের ধর্মবিশ্বাস, জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে ভাবনাচিন্তা প্রকাশ করেছেন লেখক।
--------------------------------------------------------------------------
এসব ভ্রমণে তিনি অজস্র কবি-শিল্পী-মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছেন। কবিতাই যেন তাঁর পথের দিশারি হয়ে তাঁকে দেশ থেকে দেশান্তরে নিয়ে গেছে, আর সেই ভ্রমণগুলো তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। তিন শহর তিন আকাশ নতুন বিন্যাসে, নতুন আবেদনে পাঠককে মোহিত করবে।
--------------------------------------------------------------------------
দুর্দান্ত কাব্যিক গদ্যে লিখেছেন, ‘খাবার টেবিলে এসে দেখি দুসারিতে খাবার সাজানো। ভেজিটেরিয়ান ও নন-ভেজিটেরিয়ান। যদিও আমি মাংসরুচির মানুষ কিন্তু এখানে হালাল-হারামের কথা চিন্তা করে নিরামিষাশীদের সারিতে দাঁড়িয়ে গেলাম। এতে দেখলাম ভারতীয় লেখকগণ খুব আনন্দ পেলেন।...নিরামিষ, পনির, দই ও ঝাল-টক মিলিয়ে আহারপর্বটা বেশ মজাদারই মালুম হলো। নানারূপ টকের মাধুর্য জীবনে এই প্রথম চাখলাম।’ গদ্যে লেখা হলেও গ্রন্থটির কাব্যসৌন্দর্য একটুও ব্যাহত হয়নি।
গ্রন্থের শুরুতে লেখক উল্লেখ করেছেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ‘চাঁদের অমাবস্যা’র পর তাঁর ‘কালো নৌকা’ গল্পটি দ্বিতীয় বাংলা গল্প হিসেবে ফরাসিতে অনূদিত হয়। ওয়ালীউল্লাহ্র মতো ভ্রমণের মাধ্যমে মুক্তি লাভ করেছিলেন কিনা বা আল মাহমুদ পুরো জগৎটাকে নিজের করে তুলতে পেরেছিলেন কিনা, তা জানার জন্য পাঠককে অবশ্যই এই গ্রন্থ পড়তে হবে। সেখানে তাঁর যাত্রাপথের অনুভব ও অন্বেষণ এক অনন্য বয়ন রচনা করেছে। তাঁর এই বিদেশযাত্রাগুলোর বেশির ভাগই ছিল কবিতাপাঠের আমন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। আর এসব ভ্রমণে তিনি অজস্র কবি-শিল্পী-মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছেন। কবিতাই যেন তাঁর পথের দিশারি হয়ে তাঁকে দেশ থেকে দেশান্তরে নিয়ে গেছে, আর সেই ভ্রমণগুলো তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। তিন শহর তিন আকাশ নতুন বিন্যাসে, নতুন আবেদনে পাঠককে মোহিত করবে।
তিন শহর তিন আকাশ
আল মাহমুদ
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২৬
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল, পৃষ্ঠা: ১২৮; মূল্য: ৩৪০ টাকা
10/05/2026
ব্যক্তিগত নোটে অমূল্য ইতিহাস
স্বাধীন একটি ভূখণ্ডের জন্য শত বছর ধরে সংগ্রামরত বাঙালি জাতির জন্য ১৯৭১ একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এ পর্বে রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। বাঙালির গৌরবজনক এই রাজনৈতিক অধ্যায়ের অন্যতম প্রধান চরিত্র তাজউদ্দীন আহমদ, যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে ১৯৭১ সালের জনযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। অস্থির ও উত্তাল সেই সময়ে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাও তাঁর জন্য সহজ ছিল না। তীব্র অন্তর্দলীয় কোন্দল, মতবিরোধ, বিভিন্ন পক্ষের অসহযোগিতা, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও মতাদর্শগত বিভক্তি মোকাবিলা করেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। বন্ধুর এ যাত্রাপথে তাঁকে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেক সময় হয়ে পড়েছেন একান্ত একা। এ কারণে অনেক ইতিহাস বিশ্লেষক তাঁকে ১৯৭১ সালের নিঃসঙ্গ সারথি হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।
যুদ্ধদিনের এই নিঃসঙ্গ সারথির এক দারুণ অভ্যাস ছিল। তিনি বিভিন্ন আলোচনার নোট নিতেন, ডায়েরি লিখতেন। তাজউদ্দীন আহমদের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ–পরবর্তী বাংলাদেশে ব্যক্তিগত নোট নিয়েই এ গ্রন্থ। মেধাবী, দূরদর্শী ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিনিয়ত তাজউদ্দীন আহমদকে নানা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে হতো। যোগ দিতে হতো গুরুত্বপূর্ণ নানা বৈঠকে। এসব ব্যক্তিগত আলাপচারিতা ও বৈঠকের নোটই এ গ্রন্থের প্রধান আধেয়, যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু অন্ধকার অধ্যায় সম্পর্কে অতিগুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে।
যুদ্ধদিনের একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে আলাপচারিতায় তাজউদ্দীন আহমদ বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ নোট নিয়েছিলেন। তাতে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ লিখছেন, ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পরও, অগ্রিম আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও সেক্টর কমান্ডার-২ আসেননি।
তাঁর উসকানিতে ভাষণ দেওয়ার সময় জওয়ানরা এ প্রশ্ন করেছেন? আওয়ামী লীগ তাঁদের জন্য কী করেছে, একই আলোচনায় তাজউদ্দীন আরও নোট নিয়েছেন, ক্যাপ্টেন হায়দারের প্রশিক্ষণার্থীরা, তাঁদের অর্ধেকই আওয়ামী লীগের নামে স্লোগান দেননি।—তাজউদ্দীনের নোটের এই দুটো বাক্য খুবই সাদামাটা ও সাধারণ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে ইতিহাসের গভীর অনুষঙ্গ ও যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। একটু খতিয়ে দেখা যাক। ১৯৭১ সালে সেক্টর-টু–এর অধিনায়ক ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ আর তাঁর অধীনে গেরিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতেন ক্যাপ্টেন হায়দার। মুক্তিযুদ্ধে এই দুই মুক্তিযোদ্ধার অবদান নিয়ে কোনো সংশয় নেই। কিন্তু যুদ্ধদিনে তাঁদের সঙ্গে মুজিবনগর সরকারের দ্বন্দ্ব ছিল। একটু মনে করিয়ে দিই, ১৯৭১ সালে রাজধানী ঢাকা ছিল সেক্টর টু–এর অধীনে। আর এই সেক্টরে যোগ দিতে চিন্তাচেতনায় অগ্রগামী বা কিছুটা বামঘেঁষা ছাত্র-যুবারা সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছিলেন। রুমী, বদি, আজাদরা এই দলেই ছিলেন। মুক্তিকামী এসব তরুণের অনেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রতি অনুরক্ত ছিলেন না। তাই মুক্তিবাহিনীতে তাঁদের যোগদান ও পরের দিকে নানা বিষয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তাঁদের দ্বন্দ্ব ছিল। যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত যুদ্ধ–পরবর্তী বাংলাদেশেও অব্যাহত ছিল।
সাজ্জাদ শরিফের সম্পাদনায় বইটি মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম পর্বে আছে তাজউদ্দীনের যুদ্ধকালীন নোট, পরের অংশে যুদ্ধ–পরবর্তী বাংলাদেশের। স্বাধীন বাংলাদেশের পর্বটি শুরু হয়েছে ১৯৭২ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে।
--------------------------------------------------------------------------
ফেনী জেলার এক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে আলাপচারিতায় তাজউদ্দীন নোট নিয়েছেন, ছাত্ররা দুই ভাগে বিভক্ত—মুজিববাদ ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। (পৃষ্ঠা: ৬৭) নিশ্চিতভাবেই ইঙ্গিতপূর্ণ ও অর্থবহ নোট। এ অংশেই কুষ্টিয়ার এক নেতার সঙ্গে আলাপচারিতায় তাজউদ্দীন তাঁর নোট খাতায় লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট কোলাবরেটরদের ঘাঁটি’। (পৃষ্ঠা: ৬৭)
--------------------------------------------------------------------------
ফেনী জেলার এক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে আলাপচারিতায় তাজউদ্দীন নোট নিয়েছেন, ছাত্ররা দুই ভাগে বিভক্ত—মুজিববাদ ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। (পৃষ্ঠা: ৬৭) নিশ্চিতভাবেই ইঙ্গিতপূর্ণ ও অর্থবহ নোট। এ অংশেই কুষ্টিয়ার এক নেতার সঙ্গে আলাপচারিতায় তাজউদ্দীন তাঁর নোট খাতায় লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট কোলাবরেটরদের ঘাঁটি’। (পৃষ্ঠা: ৬৭)
১৯৭৩ সালের নোটগুলোয় আরও বিস্তারিতভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বিভক্ত ও ব্যর্থ হতে যাওয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার চিত্র। আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলামের সঙ্গে আলাপচারিতার নোট নিতে গিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ লিখেছেন, স্বাধীনতাবিরোধীরা এখন বঙ্গবন্ধুকে মালা দিচ্ছেন। এ অংশেই তিনি নোট নিয়েছেন, বাংলাদেশবিরোধী শক্তি প্রচারে সফল হচ্ছে: ভারতবিরোধী, হিন্দুবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মনোভাব জাগাতে সমর্থ হচ্ছে। (পৃষ্ঠা: ৮৯)
পরবর্তী অংশেও এ ধরনের অনেক নোট রয়েছে, যেগুলো রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী পাঠকদের জন্য এসব নোট নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগাতে পারে। গ্রন্থটির শেষ অংশে তাজউদ্দীনের তিনটি ভাষণ বিশেষ সংযোজন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধদিনের এই তিনটি ভাষণ সত্যিই সুলিখিত, মুক্তিসংগ্রামের অনবদ্য দলিল।
গ্রন্থটির টীকা অংশে আছে বিভিন্ন ব্যক্তির পরিচয়। কিন্তু ঘটনা বা প্রেক্ষাপটভিত্তিক কোনো টীকা নেই। যদি ঘটনার প্রেক্ষাপটভিত্তিক টীকা সংযোজিত হতো, তাহলে অনেকের কাছে তাজউদ্দীনের নেওয়া নোটগুলোর যথার্থতা পাঠক সহজে বুঝতে পারতেন। আশা রাখছি, গ্রন্থটির সম্পাদক আগামী সংস্করণে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ–পরবর্তী বাংলাদেশ
তাজউদ্দীন আহমদ
সম্পাদনা: সাজ্জাদ শরিফ
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মূল্য: ৪২৫ টাকা; পৃষ্ঠা: ১৬৭
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the business
Website
Address
19, Karwanbazar
Dhaka
1215
Opening Hours
| Monday | 10:00 - 18:00 |
| Tuesday | 10:00 - 18:00 |
| Wednesday | 10:00 - 18:00 |
| Thursday | 10:00 - 18:00 |
| Saturday | 10:00 - 18:00 |
| Sunday | 10:00 - 18:00 |