Shaheed Comrade Tazul Islam
Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Shaheed Comrade Tazul Islam, Politician, Dhaka.
05/04/2026
Tribute-2
শহীদ তাজুল ইসলাম
শহীদ কমরেড তাজুল ইসলামকে নিয়ে লেখা একটি ঐতিহাসিক পুস্তিকা।
পাতা ১
শহীদ কমরেড তাজুল ইসলাম
সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও খেটে-খাওয়া মেহনতী মানুষের বাঁচার দাবিতে দেশব্যাপী বর্তমান আন্দোলনে ১লা মার্চ ঐতিহাসিক হরতালের দিন বাংলাদেশের বৃহত্তম শিল্প কারখানা আদমজী পাটকলে তরুণ কমিউনিস্ট শ্রমিকনেতা কমরেড তাজুল ইসলাম বীর শহীদদের মৃত্যুবরণ করেছেন। সরকার-সমর্থক কায়েমী স্বার্থের দালাল কুখ্যাত দাঙ্গাবাজ তথাকথিত শ্রমিকনেতা সাডু, রব ও তাদের সশস্ত্র গুণ্ডাবাহিনী ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে হরতালের প্রচার মিছিলে বর্বর হামলা চালিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিতভাবে তাজুল ইসলামকে মস্তকে লোহার রড দিয়ে আঘাত করে যার ফলে পরদিন তাঁর মৃত্যু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অনার্সসহ এম. এ. সমাপ্ত করে ও দেশপ্রেম এবং শোষকশ্রেণীকে উৎখাত করে শোষিত-নিপীড়িত মেহনতী মানুষের মুক্তি তথা শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মহান আদর্শের টানে পাটকলে সাধারণ শ্রমিকের চাকরি নিয়ে শ্রমিকশ্রেণীকে সচেতন, সংগঠিত ও বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করার কাজে নির্দ্বিধায়...
পাতা ২
২
আত্মনিয়োগ ও চরম আত্মোৎসর্গের মাধ্যমে শহীদ কমরেড তাজুল যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তা এ দেশের শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
কমরেড তাজুল ইসলাম ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি আদমজীনগর শিল্পাঞ্চলের একটি শাখার সম্পাদক, আদমজী মজদুর ট্রেড ইউনিয়নের সহ-সভাপতি, পাটকল ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের জাতীয় পরিষদ সদস্য। তাঁর স্ত্রী ও দুই পুত্রসন্তান রয়েছে। পিতৃহারা সন্তান দুটি এখনো অবুঝ শিশু।
গণতন্ত্র ও সমাজ-প্রগতির আন্দোলনে শহীদ তাজুল ইসলাম ১১টি শ্রমিক সংগঠনের রুটি-রুজি ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার সম্বলিত ৫ দফা এবং ১৫ ও ৭-দলীয় রাজনৈতিক জোটদ্বয়ের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের ৫-দফার দাবিতে আহুত ১লা মার্চের হরতাল সফল করতে গিয়েই হরতালবিরোধী সরকার-সমর্থক গুণ্ডাদের আক্রমণে নিহত হয়েছেন। নিজস্ব শ্রেণীগত ও জাতীয় রাজনৈতিক দাবিতে এই তাৎপর্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সফল করার জন্য দেশের সর্বত্র কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীল ট্রেড ইউনিয়ন নেতা-কর্মীরা চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। জীবন দিয়ে কমরেড তাজুল এই চ্যালেঞ্জ রক্ষা করে আদমজীতে পূর্ণ হরতাল সফল করেছেন। ছাত্র শহীদ সেলিম-দেলোয়ার, শহীদ কিশোর আখতার সহ জনতার রক্তে যে দুর্বার গণসংগ্রাম গড়ে উঠেছে তাতে শ্রমিকের...
পাতা ৩
৩
রক্ত মিশিয়ে, শিল্প-শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে বৃহত্তর তাৎপর্যে মণ্ডিত করেছেন শহীদ তাজুল।
আদমজী জুট মিল বাংলাদেশের বৃহত্তম শিল্প কারখানা। প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী এতে কর্মরত। দেশের বৃহত্তম এই কারখানায় হরতাল সফল করার জন্য কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীল ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের ছিল চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে হরতাল যাতে সফল না হয় সেজন্য মিল প্রশাসন এবং সরকার-সমর্থক সাডু-রব গোষ্ঠীর মধ্যে আঁতাত হয়েছিল। ১১-ফেডারেশনের স্থানীয় নেতারা ২৯ ফেব্রুয়ারি এ ব্যাপারে একমত হয়েছিলেন যে রাত ১০টা—ভোর ৬টা শিফট বন্ধ না করতে পারলে হরতাল সফল হবে না, কেননা এই শিফট চালু থাকলে প্রশাসন ও সাডু-রব গোষ্ঠী এই শিফটের শ্রমিকদের মিলে আটকে রেখে জোরপূর্বক মিল চালু রাখবে। কথা ছিল, রাতের শিফটে হরতালের সমর্থনে মিলের অভ্যন্তরে মিছিল করার। মূল মিছিলে শরিক হওয়ার জন্য একটি খণ্ড মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় মধ্যরাতে ব্রডলুম বিভাগ, ৩ নম্বর মিল, প্লাস্টিক ফ্যাক্টরি ও সেন্ট্রাল ওয়ার্কশপের বিশাল ৪টি শেডের সংযোগস্থলে ৪-পথের মোড়ে ওত-পেতে থাকা সাডু-রবের গুণ্ডার দল মিছিলে আক্রমণ করে পরিকল্পিতভাবে তাজুল ইসলামকে সজোরে নির্মম আঘাত করে। লেজা, বল্লম, কিরিচ, রামদা, লাঠি-সোটা নিয়ে দাঙ্গাবাজ গুণ্ডাবাহিনী আহত ভূপাতিত সংজ্ঞাহীন তাজুলকে চিকিৎসার জন্য নিতে বাধা দেয়। হাজার হাজার শ্রমিক প্রতিরোধ রচনা করে তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার পরই তাজুলের...
পাতা ৪
৪
চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু ১লা মার্চ সকাল ১১টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তখন ঢাকা নগরীসহ সমগ্র বাংলাদেশে হরতাল পালিত হচ্ছিল।
তাজুল ইসলামের মৃত্যুর পর আদমজীনগরের সাধারণ শ্রমিকরা অভূতপূর্ব ঐক্য ও জঙ্গী প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ১লা মার্চ আদমজীতে তাজুল ইসলামের জানাজায় শরিক হয়েছে ২০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। শোক সভায়ও শ্রমিক জমায়েত ছিল একই রকম। শহীদ কমরেড তাজুল ইসলামের পরিবারকে সাহায্যের জন্য আদমজীর শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছে। সাধারণ শ্রমিকদের প্রতিরোধে অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে সাডু গুণ্ডাবাহিনীসহ ১৫ দিন আদমজী এলাকায় ঢুকতে পারে নি। দেশের মিলিটারি প্রশাসন ও পুলিশের প্রকাশ্য উস্কানিজনক সক্রিয় সহযোগিতায় আরও বহু শ্রমিকের রক্ত ঝরিয়ে আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসকের সঙ্গে সশস্ত্র পাহারাদিনেই কেবল খুনী সাডু মিলে ফিরে আসতে পেরেছে। সাধারণ শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ এখনো চলছে। শহীদ কমরেড তাজুল আদমজীতে এই জাগরণের সূচনা করেছেন।
কমরেড তাজুল ইসলামের জন্ম মন্বন্তরের বছর, বাংলা ১৩৫০ সালে। কুমিল্লা জেলার মতলব থানার ইছাখালি গ্রামে, এক সাধারণ কৃষক গৃহস্থের ঘরে। কৈশোরে তাঁর মাতৃবিয়োগ ঘটে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা এত সংকটপন্ন ছিল যে কিশোর তাজুলকে...
পাতা ৫
৫
তবে সেই কৈশোরেই পড়ার আগ্রহ ছিল প্রবল। দেশে ফিরে গিয়ে মামার অভিভাবকত্বে তাই বছর তিনেক মাদ্রাসায় পড়ার পর স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। তাজুল খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষায় তিনি কুমিল্লা জেলায় প্রথম হয়েছিলেন। বৃত্তি ও প্রাইভেট টিউশনির টাকায় তাজুল নিজের পড়া ছাড়াও চাচাত ২/৩ ভাইয়ের পড়ার খরচ চালাতেন। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় তাজুল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করেন। ১৯৬৬ সালে মতলব হাই স্কুল থেকে ৩টি লেটারসহ প্রথম বিভাগে এস. এস. সি. পাস করেন। রাজধানীতে এসে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। এ সময় তাঁর বিয়ে হয়। কলেজ ছাত্রাবস্থায় তিনি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী হয়ে ওঠেন এবং আইয়ুববিরোধী ছাত্র-গণআন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৬৮ সালে প্রথম বিভাগে এইচ এস সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কমরেড তাজুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে বি. এ. অনার্সে ভর্তি হন। থাকতেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে। হলে ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বস্থানীয় কর্মী হিসেবে তাজুল পাকিস্তানের স্বৈরশাসনবিরোধী ছাত্র-গণআন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি তৎকালীন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন।
পাতা ৬
৬
এখানে উল্লেখযোগ্য যে এস এম হলে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম গ্রুপ সংগঠিত হয় তাজুল ইসলামসহ ৪ জন ছাত্রকে নিয়ে, তাঁদের মধ্যে তিনজনই শহীদ হয়েছেন। একাত্তরের ২৫শে মার্চের কাল রাতে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন কমরেড আজিম। মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ লড়াইয়ে ১১ই নভেম্বর বেতিয়ারায় শহীদ হন কমরেড আজাদ। আর তাজুল আদমজীনগরে ১৯৮৪র ১লা মার্চ। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই পার্টি গ্রুপটির চতুর্থ কমরেড আবুল কালাম আজাদ বর্তমানে কমিউনিস্ট পার্টি ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে নিয়োজিত আছেন, হাজারীবাগে ট্যানারি শ্রমিকদের মধ্যে।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে, দেশমাতৃকার মুক্তির লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাজুল। কমিউনিস্ট পার্টির অধীনে মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক কাজে তিনি সীমান্তের ওপারে আগরতলার বরদোয়ালি ক্যাম্পে দায়িত্ব প্রাপ্ত ছিলেন।
১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যপদ লাভ করেন। ঐ বছর তিনি অর্থনীতিতে এম. এ. পরীক্ষা দেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও তাঁর সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা অসমাপ্ত থাকায় রেজাল্ট উইথহেল্ড থাকে। ঐ বছর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্মেলনে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।
কমরেড তাজুল আদমজীতে যান ১৯৭৪ সালে। আদমজীতে...
পাতা ৭
৭
শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করার দায়িত্ব গ্রহণ ছিল তাজুলের মতো একজন শিক্ষিত মেধাবী মধ্যবিত্ত তরুণের পক্ষে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। কমিউনিস্ট পার্টির বিপ্লবী রাজনৈতিক লাইন অনুসারে স্বাধীনতার পর শ্রমিক-কৃষককে সংগঠিত করার জন্য আত্মত্যাগের মনোভাব নিয়ে তরুণ ক্যাডারদের এগিয়ে আসার প্রয়োজন তীব্র হয়ে উঠেছিল। তাজুল স্বেচ্ছায় এই প্রয়োজনে সাড়া দিয়েছিলেন।
দেশের বৃহত্তম শিল্প কারখানা আদমজী জুট মিল ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের দিক থেকে বহুদিন ধরেই পিছিয়ে ছিল। বুর্জোয়া সুবিধাবাদী শ্রমিক নেতৃত্ব এখানে বেশ শক্তি ও প্রভাবশালী। এই সুবিধাবাদী নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখা ও স্বীয় স্বার্থ উদ্ধারের জন্য সবসময় কৌশলে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে এবং শ্রমিকদের মধ্যে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ও আঞ্চলিক দাঙ্গা-হাঙ্গামা জিয়ে রেখেছে।
রাজধানীর সন্নিকটবর্তী দেশের বৃহত্তম এই শিল্প কারখানার বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে শ্রমিকদের সংগঠিত করার গুরুত্ব কমিউনিস্টদের কাছে অপরিসীম। ষাটের দশকে আদমজীর শ্রমিকরা গণতন্ত্র ও স্বাধিকার আন্দোলনে জঙ্গী লড়াই করলেও বুর্জোয়া সুবিধাবাদী কায়েমী স্বার্থের দালাল শ্রমিক নেতৃত্ব ও তদ্দ্বারা সৃষ্ট আঞ্চলিকতার প্রভাবে আপন শ্রেণী ও তার আদর্শ দিয়ে আপনাকে চেনার সচেতনতা আদমজীর শ্রমিকদের মধ্যে বরাবর ছিল দুর্বল। এ অবস্থায় শ্রমিক-
পাতা ৮
৮
শ্রেণীকে নিজস্ব শ্রেণীগত চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করার জন্য শ্রমিকশ্রেণীর আদর্শ মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পতাকা সেখানে বয়ে নিয়ে উড্ডীন রাখার কাজে শিক্ষিত আদর্শবাদী তরুণ ক্যাডারদের কোনো বিকল্প নেই। আর তা সফলভাবে করতে হলে বাস্তবে ঐ শিক্ষিত ক্যাডারকে শ্রমিকশ্রেণীর দৈনন্দিন জীবন ও সুখ-দুঃখের সাথে মিলেমিশে তাদেরই একজন হয়ে তা করতে হবে।
এই কঠিন চ্যালেঞ্জ কমরেড তাজুল তাঁর বিপ্লবী জীবনে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ৩ বছর তিনি বাইরে থেকে আদমজীতে যাতায়াত করে সংগঠনের কাজ করতেন। পরে সেখানে স্থায়িভাবে থাকা শুরু করেন। ১৯৭৯ সালে একজন সাধারণ বদলি শ্রমিক হিসেবে তিনি মিলে কাজ নেন। তাঁত বিভাগে একবার অল্পের জন্য তিনি দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে যান। পরে তিনি অফিসে স্টাফের কাজ করতেন, তবে বেতন পেতেন একজন শ্রমিকেরই। কমিউনিস্টদের বিপ্লবী জীবনের ব্রত নিয়ে কমরেড তাজুল দারুণ অর্থকষ্ট, একা একা রান্না করে খাওয়া, ক্লান্তিহীন কাজ সবকিছু হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন।
ছাত্রজীবনের পরে অল্প কিছুদিন তিনি ঢাকা ও সিদ্ধিরগঞ্জে সপরিবারে থেকেছেন। শ্রমিক হিসেবে আদমজীতে স্থায়ী হওয়ার পর প্রথমে কিছুদিন ঢাকা বাজুর ব্যারাকের এক ঘরে গায়ে গায়ে লাগানো ৮-চৌকির একটিতে থেকেছেন একজন কমরেডের সঙ্গে। পরে নিউ কলোনিতে ঘর পান। এখানে তাঁর স্ত্রী দুই শিশু পুত্র-
পাতা ৯
৯
সহ মাঝে-মধ্যে এসে থাকতেন। তাছাড়া সন্তানসহ স্ত্রীকে বেলতলীর বদরপুরেই থাকতে হয়। কমরেড তাজুলের উচ্চ মাধ্যমিক পাস স্ত্রী নাসিমা ইসলাম বদরপুর সরকারী প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকার চাকরি করেন। তিনি শহীদ তাজুলের বিপ্লবী জীবনের যোগ্য সাহসী সঙ্গিনীরূপে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
আদমজীনগরের পরিস্থিতি প্রগতিশীল ট্রেড ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠনের দ্রুত বিকাশের পক্ষে খুব প্রতিকূল হলেও কমরেড তাজুল ক্রমশঃ তাঁর বিপ্লবী প্রতিজ্ঞাকে আরও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে অব্যাহত গতিতে কাজ চালিয়ে গেছেন। এর সুফলও কমিউনিস্ট পার্টি ও ট্রেড ইউনিয়ন পেতে শুরু করেছিল। তাজুল হত্যার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের প্রতিরোধে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
এমন একটি সময়ে কমরেড তাজুলের প্রাণ সংহার করা হয় যখন শ্রেণীশত্রু, কায়েমী স্বার্থের দালাল, বুর্জোয়া সুবিধাবাদী গুণ্ডা শ্রমিক নেতৃত্ব ঠিকই ভবিষ্যতে নিজেদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাওয়ার আভাস পাচ্ছিল।
জাতীয় স্বার্থ, শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করার সংগ্রামে লড়াই করতে করতে কমরেড তাজুল ইসলাম একজন সাচ্চা বিপ্লবী কমিউনিস্টের মতো সাহসের সাথে শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ে প্রাণ দিলেন। তাঁর মৃত্যু শহীদের মৃত্যু, বীরের—যিনি একবারই মরেন কাপুরুষের
পাতা ১০
১০
মতো বারেবারে মরেন না। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে শ্রমিকশ্রেণীকে সংগঠিত করার জন্য কমরেড তাজুল ইসলাম আত্মত্যাগের যে স্পৃহা নিয়ে গিয়েছিলেন তা এদেশের বর্তমান যুগের কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক অনন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অকালে নির্বাপিত হলেও কমরেড তাজুলের জীবন বিপ্লবী জীবনবোধেরই এক সার্থক রূপায়ণ। তাঁর দৃষ্টান্ত তরুণ দেশপ্রেমিকদের মুক্তির পথযাত্রী হওয়ার ডাক দিচ্ছে। শহীদ তাজুলের সত্যিকার স্মৃতিমিনার হবে আদমজীতে শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি ও বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলা। শহীদ তাজুলের স্বপ্ন বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র একদিন বাস্তবায়িত হবেই। এবং এ দেশের সংগ্রামী দেশপ্রেমিক গণমানুষের অন্তরে শহীদ কমরেড তাজুল ইসলামের স্মৃতি চিরঅম্লান থাকবে।
পাতা ১১
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি আয়োজিত শোকসভার প্রস্তাব
(৬ মার্চ ১৯৮৪)
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টির ৩৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ৬ই মার্চ ১৯৮৪ দিবসটি শহীদ কমরেড তাজুলের শোক দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। ঢাকায় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ঐ দিবসের শোকসভায় গৃহীত শোক প্রস্তাবের পূর্ণ বিবরণ এখানে প্রকাশ করা হলো:
আজ ৬ই মার্চ। এদিনে আমাদের পার্টির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এবছর এদিনটি আমরা শহীদ তাজুলের শোক দিবস ঘোষণা করেছি।
আদমজীর কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক ও শ্রমিকনেতা তাজুলকে নৃশংসভাবে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। কমরেড তাজুল শ্রমিকশ্রেণীর ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ নিয়ে লড়ছিল। সমাজতন্ত্রের জন্য লড়ছিল। উচ্চশিক্ষিত হয়েও ব্যক্তিগত জীবনে শ্রমিক
পাতা ১২
১২
হিসাবে আদমজী কারখানায় মজুরের কাজ করছিল। আমাদের দেশে এই উদাহরণ বিরল। কমরেড তাজুল সমগ্র জাতির আকাঙ্ক্ষার সাথে একাত্ম হয়ে পার্টির নির্দেশে শ্রমিকশ্রেণীকে সমাজতন্ত্রের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে তোলার কাজ চালিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে গণতন্ত্রের সংগ্রামে আদমজীর শ্রমিকদের এগিয়ে এনেছিল। তাই কমরেড তাজুলকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। মিছিলের উপর হামলা চালিয়ে তাকে চিহ্নিত করেই খুন করা হয়েছে। গত ১লা নভেম্বর হরতালের প্রস্তুতিপর্বেও কমরেড তাজুলের উপর হামলা করা হয়েছিল। কাজেই কমরেড তাজুলের হত্যা কোন আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এটা সুপরিকল্পিত হত্যা।
গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও স্বাধীনতার দুশমনরা তাকে হত্যা করেছে।
এই সমাবেশ তাজুল হত্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ, ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে। এই সঙ্গে এই সমাবেশ ট্রাক চালিয়ে, গুলি করে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে তার বিরুদ্ধেও একইভাবে প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে।
এই সমাবেশ কমরেড তাজুল হত্যায় তাকে হারিয়ে গভীর শোক প্রকাশ করছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই সমাবেশ গৌরব বোধ করছে, কমরেড তাজুল তার জীবন দিয়ে সমস্ত জাতীয় গণতন্ত্রের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়েছে এবং পার্টির মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে, পার্টির রক্ত পতাকার রং আরো সমুজ্জ্বল করেছে। কমরেড তাজুল এই আমলে
পাতা ১৩
১৩
সকল কমরেডের সামনে অনুসরণ করার মতো এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসাবে ভাস্বর হয়ে থাকবে।
কমরেড তাজুল নিম্নবিত্তের সন্তান হয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু মেহনতী জনগণের মুক্তি—সমাজতন্ত্রের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি ও শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আদমজী কারখানায় মজুরের কাজ নিয়ে এক মহান উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছে। কমরেড তাজুলের এই উদাহরণ অনুসরণ করে শ্রমিক ও অন্যান্য মেহনতী মানুষের মধ্যে আরো নিষ্ঠার সঙ্গে কাজে অগ্রসর হয়ে যাবার জন্য এই সমাবেশ সকল পার্টি কমরেডের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। কমরেড তাজুলের অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নিয়েই তার প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রকাশ করতে হবে।
এই সমাবেশ কমরেড তাজুলের হত্যার বিচার দাবি করছে এবং প্রকৃত খুনীদের খুঁজে বের করে তাদের যথাযথ শাস্তি দাবি করছে।
এই সমাবেশ দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা তথা সামরিক শাসনের স্থলে গণতান্ত্রিক বেসামরিক নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা এবং শ্রমিক-শ্রেণী ও অন্যান্য জনগণের অধিকার কায়েমের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়ে এমন এক সমাজ গঠনের শপথ গ্রহণ করছে যেখানে মানুষের উপর মানুষের শোষণ থাকবেনা, থাকবে না ফাসিবাদী মনোভাব এবং হত্যা ও খুনের রাজনীতি।
এই সমাবেশ ঘোষণা করছে যে শোককে আজ শক্তিতে রূপান্ত-
পাতা ১৪
১৪
রিত করে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বর্তমানের গণতন্ত্রের সংগ্রামকে সাফল্যের দুয়ারে নিয়ে যেতে হবে। শহীদের মৃত্যু নাই। জনতার সংগ্রামে তারা অমর হয়ে থাকবে।
শহীদ তাজুলের স্মৃতির প্রতি আমরা পার্টির এই প্রতিষ্ঠা দিনে জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।
শহীদ তাজুলের স্ত্রী এবং তার পরিবারের অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের প্রতি জানাচ্ছি আমাদের গভীর সমবেদনা ও শোক।
শহীদ কমরেড তাজুল লাল সালাম।
শহীদ তাজুল ইসলাম কে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম প্রকাশনা।
প্রকাশনার তারিখ: ৬ ই মার্চ ১৯৮৪
22/03/2026
Tribute - ১ ; আব্দুল গফফার চৌধুরী, সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ।
01/03/2026
বিনম্র শ্রদ্ধা ॥
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the public figure
Telephone
Website
Address
Dhaka