Abdul Halim

Abdul Halim

Share

কখনো যদি হতাশ হও
মনটা ভেঙে যায়,
যত আকুতি প্রভুর তরে
বলিও সিজদায়।

29/09/2025

লাশ দাফনের আগেই শুরু হয়ে যায় শ্রাদ্ধের ভোজের বাজেট!

আপনার বাবা বা মা মারা গেছেন। ঘরের কোণে আপনার পৃথিবীটা চুরমার হয়ে পড়ে আছে। কান্নার শব্দে আকাশ-বাতাস ভারী। কিন্তু সেই কান্নার আওয়াজ ছাপিয়ে আপনার কানে আসবে একদল ‘দরদী’ আত্মীয়ের ফিসফাস— "ওর বাপের তো পেনশন ছিল, চল্লিশার খাওয়াটা বড় করেই দেওয়া উচিত!", "ছেলেটা তো ভালোই কামায়, গরু জবাই দেবে না খাসি?"

বিশ্বাস করুন, আপনার চোখের জল শুকানোর আগেই একদল ক্ষুধার্ত শকুন আপনার চারপাশে ঘুরতে শুরু করবে, যাদের মূল উদ্দেশ্য আপনার মৃত স্বজনের আত্মার শান্তি নয়, নিজেদের উদরপূর্তি। স্বাগতম, আপনি সেই সমাজে বাস করছেন যেখানে শোকের চেয়ে ভোজের গুরুত্ব বেশি।

আপনার বাবা হয়তো বছরের পর বছর বিছানায় পড়ে ছিলেন, ক্যান্সারের যন্ত্রণায় ছটফট করেছেন। আপনি নিজের সর্বস্ব দিয়ে তাঁর চিকিৎসা করিয়েছেন, ধার-দেনা করে রাতের ঘুম হারাম করেছেন। সেই দুঃসময়ে এই ‘আত্মীয়’দের ক’জন আপনার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল? ক’জন এক বোতল রক্ত বা দুটো টাকার সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছিল? উত্তরটা আপনার জানা। তারা তখন অদৃশ্য ছিল। কিন্তু আজ, আপনার বাবা আর নেই, আর হঠাৎ করেই তারা আপনার সবচেয়ে বড় হিতৈষী সেজে হাজির! তাদের এখন একটাই দাবি—মৃত মানুষের আত্মার শান্তির জন্য নাকি এক বিশাল ভোজের আয়োজন করতে হবে!

যদি আপনি তাদের কথা মেনে না নেন, যদি বলেন আপনার আর্থিক অবস্থা ভালো নয়, তাহলেই শুরু হবে আসল নাটক। পিঠপিছনে কানাঘুষা চলবে— "কী কপাল করে বাপটা মরেছে! একবেলা লোক খাওয়াতেও পারলো না পোলা!", "বাপের টাকায় পড়াশোনা করে আজ বড় সাহেব, আর বাপের জন্য একটা মিলাদ দেওয়ার মুরোদ নেই!" আপনার চরিত্র, আপনার ভালোবাসা, আপনার কৃতজ্ঞতাবোধ—সবকিছুকে দাঁড়িপাল্লায় মাপা হবে এক প্লেট বিরিয়ানি বা মাংসের ঝোল দিয়ে। আপনার ত্যাগের কোনো দাম নেই, আপনার নির্ঘুম রাতের কোনো স্বীকৃতি নেই, আপনার শোকের কোনো সম্মান নেই। সম্মান মাপা হবে শুধু পাতে কতটা মাংস পড়লো, তার উপর।

আর যদি আপনি সমাজের ভয়ে, লজ্জায়, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েও একটা ভোজের আয়োজন করেন? তাহলে কি আপনি ছাড় পাবেন? নাহ! তখন শুরু হবে দ্বিতীয় পর্বের সমালোচনা।

একদল আসবে বিয়েবাড়ির মেজাজে, সাথে বউ-বাচ্চা-নাতি-নাতনিসহ পুরো পরিবার নিয়ে। যেন এটা কোনো শোকসভা নয়, সামাজিক উৎসব! আরেক দল প্লেটে খাবার পেয়েই মুখ বাঁকাবে, "মাংসটা আরেকটু সেদ্ধ হলে ভালো হতো", "লবণটা কম হয়েছে, বাবুর্চি কি নতুন?"। পেট পুরে খাওয়ার পর বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে আরেকজনকে বলবে, "যা ভেবে এসেছিলাম, তেমন কিছুই খাওয়ালো না!"

সবচেয়ে ভয়ংকর হলো সেই শ্রেণি, যারা আপনার দুঃসময়ে এক ফোঁটা সাহায্য করেনি, কিন্তু আজ আপনার বাড়িতে এসে অধিকারের সাথে খেতে বসেছে। তারা আপনার শোককে পুঁজি করে নিজেদের সামাজিকতা রক্ষা করছে। এই ভোজটা তাদের কাছে শুধুই একটা ‘গেট-টুগেদার’, যেখানে তারা পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করে, আর আপনার খরচে ভূরিভোজ সারে। তাদের কাছে আপনার বাবার মৃত্যুটা একটা উপলক্ষ মাত্র।

এই লোকগুলো কারা? এরাই আমাদের সমাজের ঠিকাদার। এরাই ঠিক করে দেয় কার সম্মান কতটুকু। এরাই ধর্মের মুখোশ পরে মানবিকতাকে হত্যা করে। এদের কাছে আত্মার শান্তির চেয়ে পেটের শান্তি বড়। আপনি এদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলেই আপনাকে ‘বেয়াদব’, ‘ছোটলোক’ আর ‘অসামাজিক’ বলে ট্যাগ দেওয়া হবে। অথচ যারা জীবিত অবস্থায় একজন মানুষের খোঁজ নেয় না, কিন্তু তার মৃত্যুর পর তার লাশকে ঘিরে উৎসব করে, তাদের চেয়ে বড় অসামাজিক আর কে হতে পারে?

সমাজের এই ক্যান্সার কোষগুলো প্রতিদিন আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। আমরা এদের ভয়ে চুপ করে থাকি, আর এরা আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মৃতদেহ নিয়েও ব্যবসা করে।

এবার কিছু প্রশ্ন নিজের বিবেককে করুন:

১. যে আত্মীয় জীবিত অবস্থায় আপনার অসুস্থ বাবার পাশে দাঁড়ায়নি, তার কি আপনার বাবার শ্রাদ্ধের ভোজে অংশ নেওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার আছে?

২. মৃত মানুষের আত্মার শান্তি কি কয়েকশ লোকের ভূরিভোজের উপর নির্ভরশীল, নাকি তাঁর সন্তানের আন্তরিক দোয়ার উপর?

৩. এই লোকদেখানো ভোজের আয়োজন করে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়াটা কি বুদ্ধিমানের কাজ, নাকি সমাজের চাপে করা একটা আত্মহত্যা?

৪. যারা আপনার শোকের দিনে খাবারের মান নিয়ে সমালোচনা করে, তারা কি মানুষ, নাকি পশুর থেকেও অধম?

ভেবে দেখুন, এই প্রথাগুলো আমরাই টিকিয়ে রেখেছি। আমাদের নীরবতাই এই শকুনদের সাহস যোগায়। পরেরবার আপনার পরিবারের কান্নার শব্দ ছাপিয়ে যখন কোনো আত্মীয় ভোজের মেন্যু নিয়ে আলোচনা করবে, চুপ করে থাকবেন, নাকি মেরুদণ্ড সোজা করে প্রশ্ন করবেন— *"আমার বাবা যখন বেঁচে ছিলেন, তখন আপনি কোথায় ছিলেন?"*

#মৃত্যু_নিয়ে_ব্যবসা #সমাজের_ভন্ডামি #সামাজিক_ট্যাবু #মুখোশধারী_আত্মীয় #বাস্তবতার_চাবুক

Want your public figure to be the top-listed Public Figure in Mymensingh?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Address


Mymensingh
অপেক্ষায়থাকুন