Natural Touch

Natural Touch

Share

Organic products that made from Pure Aloevera...Try these for gaining a healthy skin....❣️❣️

16/04/2026

#না_চাইলেও_তুমি_শুধু_আমারই (৩৮)
#মাইশা_জান্নাত_নূরা (লেখিকা)

—"আপনার কি মনে হয় আমরা সবসময় কোনো না কোনো গোল পাঁ*কিয়েই থাকি?"

কাশি থামার পর তেজ স্বাভাবিক হয়ে প্রশ্নটা করলো ইলমাকে। আর ইলমা স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললো...

—"এই যে আপনি আর নির্ঝর মিলে আমাকে ও অনুকে নীরার কাছে থেকে সরিয়ে আনলেন এরপর কফি বানানো, আরো নানান বাহানা দেখিয়ে রুমে পাঠিয়ে দিলেন এগুলা তো এমনি এমনি করেন নি তাই না! কোনো একটা বিষয় আমাদের থেকে অথবা পরিবারের সবার থেকে গোপন করার জন্যই করেছেন।"

তেজ উঠে দাঁড়িয়ে বললো....
—"আপনার ভিতর থেকে সব বিষয়ে অতিরিক্ত সন্দেহ ও প্রশ্ন করার স্বভাব কি কখনও দূর হবে না ইলমা?"

—"সন্দেহ থেকে কেউ এতোটা মিল রেখে কথা বলতে পারে বলে আপনার মনে হয় তেজ?"

তেজ ইলমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো....
—"মানে?"

—"মানে টা খুব সহজ। আপনার কথামতো তখন আমি অনুকে নিয়ে রুমে ঠিকই গিয়েছিলাম কিন্তু আমার খচখচানি স্বভাবটা আমায় রুমে স্থির থাকতে দেয় নি। একটু পর বের হতেই শুনলাম আপনি ডাক্তার আঙ্কেল ও আপনার বাবাকে বললেন নির্ঝর কোথায় তা আপনি জানেন না। অথচ আপনি নিজেই নির্ঝরকে তার রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বলেছিলেন। এখন কি বলবেন এসবও আমি মিথ্যা বলছি?"

তেজ বুঝতে পারলো ইলমার থেকে লুকানোর চেষ্টা করে আর কোনো লাভ হবে না কারণ ইলমা ঘটনার অনেকাংশই অনুমান করতে পেরেছে। তেজ শব্দ করে একবার নিঃশ্বাস ফেলে বললো....

—"আর মিথ্যে বলে যে লাভ নেই তা আমি বুঝতে পেরেছি। তবে এখন সত্যটা শোনার পর কোনোরকম রিয়াক্ট করবেন না আপনি আর না এই বিষয়ে কাউকে কিছু বলবেন, অনুকে তো একদমই না। কথা দিন!"

এই বলে তেজ ওর ডান হাতটা মেলে বাড়িয়ে দিলো ইলমার দিকে। ইলমার ভ্রু'জোড়া কিন্ঞ্চিত কুঁচকে এলো। ইলমা কয়েকসেকেন্ড তেজের হাত ও ওর চোখের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলো। অতঃপর 'বেশ করলাম প্রমীস' বলে তেজের ডান হাতের তালু আলতো ভাবে স্পর্শ করে সঙ্গে সঙ্গেই সরিয়ে নিলো। তেজ আশেপাশে নজর বুলিয়ে ধীর স্বরে বললো.....

—"নির্ঝর অনুকে পছন্দ করে।"

তেজের এই ৪ শব্দের বাক্যটা শোনামাত্র ইলমার মাথায় যেনো ভাড়ি কোনো কিছু ভে*ঙে পড়লো। ফলস্বরূপ ওর মুখ হা হয়ে গেলো। চোখের আকৃতিও স্বাভাবিক এর তুলনায় বড় হয়ে গিয়েছে। তেজ আবারও বললো....

—"এইটুকু শুনেই এতো অবাক হলেন! বাকিটুকু শুনলে তো মনে হয় সেন্সলেস হয়ে যাবেন।"

ইলমা ওর মুখ বন্ধ করে নিয়ে একবার ঢোক গিললো। কিন্তু অবাক এর পাশাপাশি স্তব্ধ ভাব এখনও ওর মুখশ্রী জুড়ে ফুটে আছে। তেজ দম ফেলে বললো....

—"এখানে আসার আগে আপনাকে নিয়ে কফিশপে গেলাম অনু আর নির্ঝর বাংলো বাড়িতে একলা ছিলো মনে আছে আপনার?"

ইলমা উপর-নীচ মাথা নেড়ে 'হ্যাঁ' সূচক জবাব দিলো। তেজ বললো....

—"অনু অসুস্থ ছিলো আগে থেকেই এরপর ওর অসুস্থতার মাত্রা আরো বেড়ে গেলে নির্ঝর আমাদের পারিবারিক ডাক্তারকেই দেখিয়েছিলো সেদিন অনুকে। ঐ ডাক্তার-ই আজ নীরাকে চেক-আপ করতে এসেছিলেন কিছুক্ষণ আগে। আর ফাঁকা বাড়িতে দু'জন নর-নারীর একসাথে থাকাটা হোক সেটা কোনো এক পক্ষের সমস্যা তবুও সমাজ তো তা স্বাভাবিক ভাবে নিতে চায় না। তাই সেদিন ডাক্তারের সামনে নির্ঝর অনুকে ওর হবু বউ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলো।"

এই কথা শোনামাত্র ইলমার একহাত অটোমেটিক ওর মাথায় চলে গেলো আর মুখ দিয়ে বেড়িয়ে এলো 'আল্লাহ' শব্দ। তেজ থেমে গেলো মিনিট খানেকের জন্য। ইলমা এই সময়ের মধ্যে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললো.....

—"অনু এ বিষয়ে কিছুই জানে না তাই না?"

তেজ এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়িয়ে 'না' সূচক জবাব দিলে ইলমা শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলে বললো...

—"এই কারণেই তাহলে এতোসময় ধরে চলছিলো আপনাদের দুই ভাইয়ের রাখ-ঢাক।"

তেজ জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করে বললো....
—"কি করবো বলুন! শত দোষ-ভুল করলেও আমারই ছোট ভাই নির্ঝর। অসময়ে শুকনো কুয়োর ভিতর ধা*ক্কা দিয়ে কি করে ফেলতাম! বাঁচানোর এই ছোট্ট প্রচেষ্টা তাই করতেই হলো।"

—"কিন্তু এভাবে কতোদিন চলবে?"

—"কেনো? আপাতত তো পুরো বিষয়টা মেনেজ হয়েই গেলো। তাহলে আর কি ঝামেলা থাকছে এ নিয়ে?"

—"অনুর মানসিক অবস্থা সম্পর্কে তো আপনি খুব ভালো ভাবেই অবগত তেজ। আর সামনে সারফারাজ ভাইয়া ও পিহু ভাবীর বিয়ের অনুষ্ঠান করা হবে বড় করে। তখন তো আবারও আসবেন এই ডাক্তার আঙ্কেল সেখানে। আপনার পরিবারের সবার সাথে সাক্ষাৎ কালীন তো তিনি এই সব বিষয়ে কথা আবারও তুলতেই পারেন তাই না! তখন ঐ ভরা সমাজে সব সত্য কিভাবে চেপে রাখবেন আপনি?"

তেজ ইলমার কথা শুনে খানিক চিন্তায় পরে গেলো। ইলমা আন্দাজ করে যা বললো তা শতভাগই সত্যি। কিয়ৎক্ষণ নীরব থাকার পর তেজ হুট করেই বলে বসলো....

—"যদি নির্ঝর ওর মনের অনুভূতি গুলো আগেই অনুকে জানিয়ে দেয়! তারপর বাড়ির সবার সাথে কথা বলে একটা পজেটিভ ফয়সালা করে রাখা হয়! তাহলে তো আর নতুন করে ঝামেলা হবে না।"

—"আপনি কি শুনলেন না আমি কি বললাম? অনুর মানসিক অবস্থা এমনিতেই আনস্টেবল। হুট করেই অনু ওর নিজের উপরেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে পুরোনো স্মৃতি মনে করে। পুরোপুরি সুস্থ হতে তাই যথেষ্ট সময় প্রয়োজন ওর। আর ওর বয়সও মাত্র ১৬! এতো কম বয়সী একজন মেয়ে যার এমন ভয়াবহ একটা অতীত আছে সে সম্পর্কে আপনার পরিবার জানতে পারলে কি মেনে নিবে তারা অনুকে নির্ঝরের জন্য? সবথেকে বড় কথা হাতে সময়ই আছে কয়েকদিন। এর ভিতর এমন এমন ধাপগুলো পেরিয়ে সব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কি এতো সহজ বলে মনে হচ্ছে আপনার?"

তেজ আবারও ধপ করে বসে পড়লো সোফায়। দু'হাতে মাথার দু'পাশের চুলগুলো মুঠো করছে আর ছাড়ছে সে। এভাবে একই কাজের পুনরাবৃত্তি কয়েকবার করার পর তেজ চোখ তুলে ইলমার দিকে তাকিয়ে বললো....

—"তাহলে আপনিই একটা উপায় বলে দিন ইলমা। নয়তো অনেক বড় স*র্ব*নাশ হয়ে যাবে।"

—"আমাকে আগে নির্ঝরের সাথে কথা বলতে হবে।"

—"কি কথা বলবেন আপনি?"

—"জানতেই পারবেন।"

এই বলে ইলমা তেজকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেলো নির্ঝরের রুমের উদ্দেশ্যে। তেজ ইলমার যাওয়ার পানে তাকিয়ে বললো....

—"নিজ্ঝরিয়ারে তোর নিজের জন্য খোঁড়া কবরে সবার আগে আমাকেই দাফন করা হবে বলে মনে হচ্ছে।"

এই বলেই তেজও উঠে ছুটলো ইলমার পিছু পিছু।

ইলমা নির্ঝরের রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ভিড়িয়ে রাখা পর্দাটা দু'হাতে সরাতেই দেখলো নির্ঝর কেবল একটা হাফ প্যন্ট পড়ে গলায় টাওয়াল ঝুলিয়ে চোখ বন্ধ করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে উড়াধুরা নাচছে। মাইক্রোফোন হিসেবে মুখের কাছে ধরে আছে নিজের ফোনটা। বিছানার উপর রাখা মিনি সাউনবক্সটাতে গান বাজছে সেই গানের তালে নিজের বেসুরা কন্ঠে নির্ঝরও গান করতেছে। গানটা হলো....

"বেলতলি সুলেমান ল্যংটা
দোহাই ল্যংটা, দোহাই ল্যংটা
কাটাকেল্লা কাটাকেল্লা
কেল্লায় করে আল্লাহ আল্লাহ
গুণিশাহ আর কান্দুশাহ
ভক্তে করে তোমার আশা
রাহখালি শাহ, সুবহান শাহ
তুমি ভক্তের মুশকিল গো আসান
গুলিস্তানের গোলাপ শাহ বাবা
চরণ ধুলি আমায় দিবা...."

তেজ ইলমার পিছনে এসে দাঁড়াতেই নির্ঝরের এমন অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে নিজের পায়ে থাকা ঘরোয়া একটা জুতা খুলে সোজা ছুঁড়ে মারলো নির্ঝরের দিকে। যা গিয়ে লাগলো নির্ঝরের জায়গা বরাবর। নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে সেই জায়গা দু'হাতে চেপে ধরে 'আহহহ মা গো আমার বংশের বাত্তি নিব্ভা গেলো গো' বলে চিল্লিয়ে উঠে হাঁটু ভাঁজ করে মেঝের উপর বসে পড়লো। ইলমা সঙ্গে সঙ্গে ওর দু'চোখ ঢেকে নিয়ে বললো....

—"যান আপনার ভাইকে গিয়ে সামলান আপনি আমি আর এখানে থাকতে পারছি না।"

এই বলে ইলমা তৎক্ষণাৎ তেজের পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। তেজ রুমের ভিতরে প্রবেশ করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো....

—"শুয়ো*** জাত, বাহিরে আমি জান হাতে নিয়ে পুরো বিষয়টা হেন্ডেল করলাম আর তুই রুমে এসে অর্ধ ল্যংটা হয়ে ল্যংটা শব্দ ওয়ালা গানে ডান্স করছিস?"

নির্ঝর ওর ব্যথা হজম করার চেষ্টা করে বললো....
—"তাই বলে সোজা আমার বংশের বাতির উপর জুতা ছুড়ে মারবে তুমি তেজ ভাই! একটুও দয়া হলো না তোমার? জানোই তো বাচ্চা-কাচ্চার কতো শখ আমার।"

—"চুপ শা*লা। আর একটা কথা বললে তোর এই মুখটা সোজা কমোডে চুবাবো আমি।"

—"মাফও চাই দোয়াও চাই। এই মুখ যদি কমোডে চুবাও তুমি তাহলে বিয়ের পর বউকে চুমু খাওয়ার জন্য আমার মুখটা আর পবিত্র থাকবে না।"

—"শা*লা তোর বিয়েই হবে না। বউকে চুমু খাওয়া আর বাচ্চা পয়দা করা তো বহুত দূরের বিষয়।"

—"শ*কুন রূপ নিয়ে এই গরুকে অভি*শা*প-টভি*শা*প পরে দিও। আগে আমায় ধরো। আহহহ, কি ব্যথা।"

এই বলে নির্ঝর ওর একহাত তেজের দিকে বাড়িয়ে দিলে তেজ তা ধরে জোড়ে টান দিয়ে উঠালো নির্ঝরকে। ফলস্বরূপ নির্ঝরের শরীর ঝাঁ*কুনি দিয়ে উঠলো আর ব্য*থার জায়গাটাতে আরো ব্য*থা অনুভব হলো। নির্ঝর ধাম করে বিছানার উপর বসে মুখ দিয়ে ব্যথায় উদ্ভট সব শব্দ বের করতে করতে বললো......

—"এখানে কি কোরিয়ান সিরিজের সুটিং চলছিলো তেজ ভাই? ওমন হ্যচকা ভাবে টেনে তুললে কেনো আমাকে? আমার জায়গায় কোনো মেয়ে থাকলে না হয় অন্য কথা ছিলো। টেনে তোলার সাথে সাথে সে তোমার বুকের উপর আছড়ে পড়তো, কয়েক সেকেন্ড চোখাচোখি হলে পর চুমু-টুমুও খাওয়া হতো।"

তেজ এবার মহাবিরক্তি নিয়ে এক পা তুলে নির্ঝরকে লা*থি মারার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বললো.....

—"অপ্রয়োজনীয় আর একটা কথা বললে সারাজীবনের জন্য এবার তোর বংশের বাতি নিভিয়ে দিবো আমি।"

নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখ চেপে ধরলো একহাতে। ইশারায় বুঝালো সে আর একটা শব্দও আপাতত উচ্চারণ করবে না। তেজ ওর পা নামিয়ে নিলো।


✨❣️✨❣️✨❣️

নীরার জ্ঞান ফিরেছে অনেক আগেই। এখন অনেকটাই সুস্থ ও। জ্ঞান ফেরার পরপরই ওর মা-চাচীরা বসে থেকে নিজ দায়িত্বে ডাক্তারের বলা অনুযায়ী তরল খাবার খাইয়ে দিয়েছে নীরাকে। সেই তরল খাবার পিহু খুব যত্ন করে বানিয়ে দিয়েছিলো। এ বাড়ির কোনো একজন সদস্য হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার যত্নের অভাব হয় না। এতো এতো যত্নেই সে সময়েই আগেই সুস্থ হয়ে উঠে। এমন পরিবার প্রতিটি মানুষের কামনাতেই থাকে হয়তো।

নীরাকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট নির্বাণ। নির্বাণের নিষ্পাপ, শান্ত, মায়াবি মুখের দিকে তাকিয়ে নীরা শব্দ করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো....

—"তোর কি সত্যিই বাবার প্রয়োজন আছে নীর?"

একটু থেমে আবার বললো....
—"যেই বাবা ছাড়া পুরো প্রেগ্ন্যাসির জার্নি পার করলাম। এতো যন্ত্রণা সহ্য করে তোকে জন্ম দিলাম। দেড় বছর বয়সে এসে দাঁড়িয়েছিস এখন তুই। তাহলে আগামীতে কেনো লাগবে তোর কোনো বাবাকে? একটা পিতৃপরিচয় ছাড়া কেনো চলা সম্ভব না তোর জন্য? বড় জানতে চাইলেন সমাজ কি বলবে যখন সবাই তোর কথা জানবে! আমি কোনো উত্তর কেনো দিতে পারলাম না? আমি কেনো বলতে পারলাম না, সমাজে ধার আমি ধারি না। এই সমাজেরই তো কোনো এক কু*কু*র আমায় অচেতন করে তার কু*পুরুষত্ব খাঁ*টিয়ে দেহের জ্বা*লা মিটিয়ে গিয়েছিলো সেদিন। তাহলে এই সমাজের অধিকার হয় কিভাবে আমার চরিত্রের দিকে আঙুল তোলার? তোর জন্ম পরিচয় নিয়ে তোকে খোঁ*টা দেওয়ার?"

নীরার দু'চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো নোনাজলেরা। নীরা তা মুছলো না। পড়তে দিলো। কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার বললো....

—"এই জীবনে কোনো পুরুষকে ঠাঁই দেওয়ার পর যদি সেই পুরুষও ঐ কু*কু*রের মতো স্বভাবের হয়ে থাকে তখন কি হবে? ভালোটা হতে গিয়ে আরো খারাপটা কি হয়ে বসবে না তখন আমার সাথে? তুই তো বাবা পাবি না তখন।"

নীরা নিজ হাতে ওর নিজের কপাল আলতো ভাবে টিপতে শুরু করলো। চোখ-মুখ হালকা কুঁচকে নিয়েছে। আজকে হওয়া প্যনি*ক অ্যা*টা*ক এর আগেও বেশ কয়েকবার হয়েছিলো নীরার। সেটা কানাডা থাকাকালীন সময়েই। যখন নির্বাণ ওর গর্ভে ছিলো। প্যনি*ক অ্যা*টা*ক থেকে একটু রিলিফ পাওয়ার পরই মাথাটা য*ন্ত্র*ণা করে ওর অতিরিক্ত। আজও তার ব্যতিক্রম কিছু হচ্ছে না। নির্বাণকে ভালোভাবে শুইয়ে দিয়ে নীরা সোজা হয়ে বসলো। অতঃপর বললো....

—"সব পুরুষ কি কু*পুরুষ হয়? কিছু পুরুষ তো আমার বাবা-চাচা, ভাইদের মতো সুপুরুষও হয়। তাদের মতো কাউকে কি পাওয়া সম্ভব এই পো*ড়া কপাল নিয়ে? যে আমার থেকেও বেশি নির্বাণকে ভালোবাসবে। আপন করে নিবে ওকে। কখনও যেনো নির্বাণের এমনটা মনে না হয় সে ওর জন্মদাতা পিতা নয়!"

তখনই নীরার রুমে প্রবেশ করলো পিহু। পিহু বললো....

—"পুরুষ জাতিকে এক সময় ঘৃ*ণা আমিও করতাম নীরা। কিন্তু তোমার ভাই ঝড়ের মতো কোনো বার্তা ছাড়া আমার জীবনে এসে সব ভুল ধারণাকে দূরে সরিয়ে পুরুষ জাতির প্রতি বিশ্বাস-ভরসা করা যায় যে সেটা মানতে বাধ্য করেছে। তাই কেবল খা*রাপ চিন্তাগুলোকে মনে জায়গা দিও না। একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে ভালোটা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেখো একবার। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার বান্দাদের সব দিক থেকে দুঃখী করেন না। ভরসা রেখো তাঁর উপর।"

নীরা নিরব রইলো।

✨❣️✨❣️✨❣️

সন্ধ্যেবেলা.......
খান বাড়ির সব জুনিয়র সদস্যরা রেডি হয়ে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হয়েছে মাত্রই। বিকেল বেলা সপিং-এ যাওয়ার কথা ছিলো ওদের। কিন্তু নীরার শরীরটা খারাপ থাকায় ওকে বিশ্রাম নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় সারফারাজ দিয়েছিলো। এখন নীরা পুরোপুরি সুস্থ বোধ করছে বিধায় সবার সাথে সপিং-এ যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে।

নীরা নির্ঝরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে কোলে থাকা নির্বাণকে ওর দিকে এগিয়ে দিলে নির্ঝর নিয়ে নিলো। নীরা বললো.....

—"ছোট ভাইয়া, আজ সপিং করার পুরো সময়টাতে নির্বাণকে সামলানোর দায়িত্ব তোমার। তখন আমি না তোমাকে চিনবো আর না এই বাঁ*দর ছেলেকে। বুঝলে!"

নির্ঝর আহ্লাদী স্বরে বললো....
—"হেহ্ যা যা। আমার ভাগ্নে কখনও আমার কাছে বেশি হবে না। তুই সারাজীবন নিজের কাছে না নিতে চাইলেও ওকে আমিই পেলে-পুষে বড় করতে পারবো।"

নীরা ভেং*চি কেটে বললো....
—"তার প্রমাণ আজই পাবো।"

নির্বাণ ওর হাতে থাকা প্লেন খেলনা নিয়ে খেলতে ব্যস্ত ছিলো জন্য আপাতত কোল বদল নিয়ে ওর কোনো সমস্যাই ছিলো না। অনু আর ইলমা ১ম এ ওদের সাথে যেতে চাইছিলো না কিন্তু পিহুর কথায় যেতে হচ্ছে ওদেরও। বাড়ির সিনিয়র মহিলা সদস্যরা বলেছেন, 'তাঁদের যা কেনা-কাটা করার তারা অনলাইন অর্ডার করেই নিয়ে নিবেন। এই বয়সে সপিংমলে ঘুরে ঘুরে সপিং করার ধৈর্য আর তাদের কারোর মাঝে নেই।' পিহুর বাবা এ বাড়িতেই তার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে বিশ্রামে আছেন। পায়ে লাগা গু*লির জায়গাটার ব্য*থা সারে নি পুরোপুরি। বেশি হাঁটাচলা বা বেশি সময় কোথাও বসে থাকাটা তার জন্য অনেক কষ্ট কর হয়ে উঠে। আর এক্ষেত্রে ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞাও আছে।

অতঃপর সবার থেকে বিদায় নিয়ে খান ভিলা থেকে বেড়িয়ে পড়লো ২ টো গাড়ি নিয়ে। সারফারাজ, পিহু, নির্ঝর-নির্বাণ এক গাড়িতে। অন্য গাড়িতে তেজ, ইলমা, অনু ও নীরা যাচ্ছে। একটা গাড়ি সারফারাজ ড্রাইভ করছে আর অন্যটা তেজ।

প্রায় ৪০ মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করার পর ঢাকার সবথেকে বড় সপিংমলে সামনে এসে গাড়ির ব্রেক কষলো ওরা। সবাই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। সারফারাজ আর তেজ পার্কিং সাইডে গাড়িটা রাখতে চলে গেলো। একটু পর ওরা আসতেই সবাই একসাথে সপিংমলের ভিতরে প্রবেশ করলো। এর আগেও পিহু একবার এখানে এসেছিলো সারফারাজের সাথে। যখন কলেজ থেকে পিহুকে উঠিয়ে নিয়ে সারফারাজ সপিং মলে এনে ওকে শত প্রকার বোরখা-হিজাব-থ্রিপিচ ইত্যাদি জিনিস কিনে দিয়েছিলো ওর অনিচ্ছা স্বত্তেও।

সেইদিনের স্মৃতি মনে হতেই পিহুর ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠলো। দিনগুলো কিভাবে যেনো কেটে গেলো! রুচি বদলালো, পছন্দ বদলালো। যেই সারফারাজকে পিহু সহ্য করতে পারতো না বললেই চলে আজ ২য় বার তাঁর সাথেই সেই একই স্থানে এসেছে তাঁদেরই বিয়ের সপিং করতে।

ইলমা-অনু-নীরা পিহুর জন্য বিয়ের বেনারসি দেখতে শুরু করেছে প্রথমে। পিহুকে অবশ্য সারফারাজ জিজ্ঞেস করেছিলো সে কি পড়তে ইচ্ছুক! শাড়ি নাকি লেহেঙ্গা! পিহু শাড়ির কথাই বলেছিলো সরাসরি। কথাতেই আছে শাড়িতেই নারী। আর সে যদি হয় বাঙালি তাহলে তো কোনো সন্দেহ ছাড়া শাড়িই বেছে নিবে।

তেজ সারফারাজকে নিয়ে শেরওয়ানি কালেকশন গুলো দেখছিলো। এদিকে নির্ঝর বেচারা সেই বাসায় থাকাকালীন সময় থেকে হাত বদল করে করে নির্বাণকে কোলে রেখে এখনই ক্লান্ত বোধ করছে। হাত ঝিম লেগে লেগে আসছে ওর। এই পরিবেশে ওকে কোল থেকে নামিয়ে দেওয়াটাও নিরাপদ মনে করছে না জন্য নামায় নি।

প্রায় ঘন্টাখানেক পর.....
নির্বাণ নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে আধো আধো স্বরে বললো....

—"মামা, সি সি।"

নির্ঝর প্রথমে বুঝলো না। জিজ্ঞেস করলো আবারও....
—"কি সি সি!"

—"আমাল সি সি পেয়েচে নি নি ঝোল মামা।"

এবার বুঝতে পেরে নির্ঝর তৎক্ষনাৎ নির্বাণকে নিয়ে ছুটলো ওয়াশরুমের দিকে। ওয়াশরুমে এসে ওকে কোমডের উপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললো.....

—"নে কর সি সি।"

—"আলে প্যন্ত কুলো।"

নির্ঝর ওর কপাল চাপড়ে প্যন্টটা পুরো খুলে দিলো। নির্বাণ সি সি করার পর পরই বললো....

—"আমি হাক্কুও কববো।"

নির্ঝর দাঁতে দাঁত চেপে বললো...
—"বাসা থেকে করে আসতে কি হয়েছিলো তোমার বিট্রিশের বংশধর!"

নির্বাণ বললো.....
—"এখানে কববো না হাক্কু। এতা পতা।"

—"এখানে না করলে কই করবি?"

—"না না এখানে কববো না। মামা, খুব হাক্কু পেয়েচে। আমি হাক্কু কববো। এখানে না।"

—"ওহহ আল্লাহ, এখন আমি একে নিয়ে কই যাবো!"

নির্বাণ ওর পিছন চেপে ধরলো নিজের ছোট্ট দু'হাত দিয়ে। আর বললো.....

—"মামা, হাক্কু হাক্কু পললো....পললো!"

বলতে বলতেই ঐ দাড়ানো অবস্থাতেই নির্বাণ কাজ সেরে ফেললো। ফলস্বরূপ কিছুটা ছিঁটে নির্ঝরের প্যন্টে এসেও লাগলো। নির্বাণের পা ও অনেকটা মেখে গিয়েছে। নির্বাণের এমন কর্মকাণ্ড দেখে নির্ঝরের মুখ হা হয়ে গেলো। এই স*র্ব*নাশা কান্ড যে ঘটালো নির্বাণ এবার এসব পরিষ্কার কে করবে?

#চলবে_ইনশাআল্লাহ.......

16/04/2026

#সিকান্দার_শাহ্
#পর্ব_৬


সকালের আলো ফুটেছে অনেক আগেই। সিকান্দার ফজরের নামাজ পড়ে আবার শুয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই ঘুম বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় নি। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ কানে আসতেই বিরক্তিতে তার চোখ মুখ কুঁচকে আসে। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দরজা খুলতেই দেখতে পেলো সেলিম মির্জা কে। বিরক্তিতে চ সূচক শব্দ উচ্চারণ করলো ঠোঁটের আগায়। দরজা থেকে সরে ঘুমঘুম চোখে সোফায় বসে বলল-

“ আপনি দেখছি আমাকে শান্তি দিচ্ছেন না। রাতে ঘুমাতে হয় আপনার সাথে কথা শেষ করে। আবার সকালে ঘুম ভাঙে আপনাকে দেখে। আবার কি বলতে এসেছেন? তাড়াতাড়ি বলুন। ”

সেলিম মির্জা মনে মনে ছেলের উপর অসন্তুষ্ট হলেও তা প্রকাশ করলেন না। পাশে বসে বললেন-

“ সব কিছু কমপ্লিট। ”

“ সব কিছু কমপ্লিট মানে? কি কমপ্লিট?”

“ মানুষজন দাওয়াত দেওয়া শেষ। আমার সকল সহকর্মী বন্ধু বান্ধব দের আমন্ত্রণ করেছি। কমিউনিটি সেন্টারও বুকিং করা শেষ। তারা ১৩-১৫ তারিখের জন্য সব আয়োজন করে দিবে।”

সিকান্দার কপালে আঙুল দিয়ে স্লাইড করছিলো। সেলিম মির্জার এমন কথা শুনে বলল-

“ আমি কখন এসবের দায়িত্ব আপনাকে দিলাম? আপনাকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম শুধু বিয়ে ঠিক করা অব্দি। এত কিছু তো করতে বলি নি। আর কমিউনিটি সেন্টার বুকিং করছেন, আমার থেকে জেনে করছিলেন? ”

“ কি আশ্চর্য তোমার থেকে সব জেনে করতে হবে আমাকে?”

“ বিয়ে যেহেতু আমার। সেহেতু আপনি অবশ্যই জেনে করবেন সবকিছু। ”

“ কি ভুলটা করেছি আমি এখানে? আমার ছেলের বিয়ে আমি আমার সহকর্মী দের ইনভাইট করবো না? ছেলের বিয়ে ধুমধাম করে দেওয়ার জন্য কমিউনিটি সেন্টার বুক করবো না?”

“ আপনার সহকর্মী রা আমার বিয়েতে এসে কি করবে? আপনার সহকর্মী বলতে তো সব পুরুষ,এমপি, মন্ত্রী, মিনিস্টার। ”

“ আমার ছেলের বিয়েতে তারা আসবে না? ”

“ কেনো আসবে সেটা জিজ্ঞেস করছি। ”

“ আমার ছেলে আর ছেলের বউকে দেখতে। ”

“ আমার বউ তারা কেনো দেখতে আসবে?”

“ মানে? এটা কেমন কথা?”

“ আমার বউ কি কোনো ফার্নিচার যে তারা এসে দেখবে? আমার বউ তো আমি কাউকে দেখাবো না। দাওয়াত যখন দিয়েই ফেলছেন ফিরিয়ে নেওয়া তো সম্ভব না। আসবে,এসে খেয়ে দেয়ে দোয়া করে চলে যাবে। সেন্টার বুকিং করার তো কোনো দরকার ছিলো না। ”

“ তুমি বিয়ে করবে না? ”

“ করবো। ”

“ কোথায় করবে তাহলে সেন্টারে না করলে? আমেরিকায় গিয়ে?”

“ মসজিদে করবো বিয়ে। আর ওয়ালিমার অনুষ্ঠান এ বাড়িতেই হবে। ”

“ বাড়িতে! এত কম সময়ে কিভাবে কি করবে? এজন্যই তো আমি সেন্টার বুক করেছিলাম। আর সালমানই বা কিভাবে কি করবে এত কম সময়ে? ওর দিকটা দেখবে না? ওর কি আমাদের মতো গাদা গাদা টাকা আছে? ”

“ কথায় কথায় টাকা শব্দ টাকে তুলে আনেন কেনো? কম টাকায় কি বিয়ে করা যায় না? কেউ করে না? সবার কি আপনার মতো অঢেল টাকা? চাচাকে ধুমধাম করে আয়োজন করতে মানা করেছি আমি। ঘরোয়া ভাবে হবে ও বাড়িতে মেহেন্দি, গায়ে হলুদ আর বিয়ের অনুষ্ঠান। আপনি কি বরযাত্রী হিসেবে দেশের সকল লোক নিয়ে যেতে চাচ্ছেন নাকি যে এত ঘেমে যাচ্ছেন সাধারণ বিষয় নিয়ে। আর তাছাড়া সব কিছু করা শেষ। বাহিরে তাকিয়ে দেখুন। ”

সেলিম মির্জা উঠে বাহিরে তাকিয়ে দেখলো বাহির থেকে লোকজন বাঁশ, ফুল,ঝাড়বাতি এসব নিয়ে আসছে ডেকোরেশনের জন্য।

“ তুমি আমাকে বলবে না যে তোমার বিয়ের সব তুমিই করছো? কতগুলো টাকা দিয়েছি সেন্টারে জানো?”

“ আপনার টাকা বেশি তাই আপনি দিয়েছেন আমার সাথে পরামর্শ না করেই। ”

“ তুমি দিনকে দিন অভদ্র হয়ে যাচ্ছ সিকান্দার। ”

“ সেটা কেবল আপনার আপনার বউয়ের কাছেই মনে হয় । মেবি আপনাদের চোখ ভালো কোনো ডক্টরের কাছে দেখাতে হবে। ভালো চশমা নিতে হবে চোখে। তাহলে আই থিংক আমাকে ভালো লাগবে আপনাদের। ”

“ আমার মানসম্মান টা আর রাখলে না। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে কি না ছেলের বিয়ে ছোট পরিসরে দিব! ”

“ আপনি কোথায় দিচ্ছেন বিয়ে। আমার বিয়ের আয়োজন খরচ সব আমিই বহন করছি। কোনো কিছুর কমতি হলে মানসম্মান গেলে আমার যাবে। আপনার যাবে কেনো? ”

“ ছেলেটা কার তুমি শুনি? তোমাকে ডাকতে হলে সর্বপ্রথম আমার নামটাই তাদের মুখে নিতে হবে। তাহলে আমার মানসম্মান জড়িয়ে রইলো না?”

“ ওয়েল। ভরসা রাখুন,আপনার সহকর্মী দের আপ্যায়নে কোনো কমতি হবে না। ”

“ তুমি ইচ্ছে করেই এমনটা করছো তাই না? পুরোনো ক্ষোভ গুলো এভাবে ঝাড়ছো। ”

“ আপনার সাথে তর্ক করে আর এনার্জি নষ্ট করতে চাই না। আপনি প্লিজ আসুন। সকাল সকাল আমার মুডের ১২ টা বাজিয়ে দিচ্ছেন। ”

“ তুমি ২৪ টা বাজিয়ে দিয়েছো আমার। যদি আমার মানসম্মান খুইয়েছ তুমি তাহলে আমার চেয়ে খারাপ কিন্তু আর কেউ হবে না। ”

সেলিম মির্জা চলে গেলেন। সিকান্দার হাই তুলতে তুলতে নিচে আসলো। ম্যানেজারের সাথে কথাবার্তা বললো। ম্যানেজার আস্বস্ত করে বললো তার পছন্দ মতোই সবটা হবে ডেকোরেশন।

দুপুরের দিকে মুনতাহাদের বাড়িতে একটা পার্সেল আসলো মুনতাহার নামে। নিচে নেমে পার্সেল টা রিসিভ করলো। বড়সড় একটা পার্সেল। পার্সেলের গায়ে সিকান্দার শাহ্ এর নাম লেখা। তারমানে উনি পাঠিয়েছেন এটা! কি আছে? রুমে নিয়ে খুলে দেখলো এক বক্স হিজাব। প্রায় সব রঙেরই হিজাব আছে। সাথে সাথে মেসেজ আসলো ফোনে-

“ সেদিন অনেকটা দেরি হয়ে যাচ্ছিলো,
আপনাকেও ক্লান্ত লাগছিলো বলে আপনার বাকি জিনিস গুলো আর কেনা হয় নি। আমি তারপরের দিন গিয়ে কিনে এনেছি। শুনুন পোশাকের সাথে হিজাব ক্যারি করবেন প্রতিটি অনুষ্ঠানে। আর হ্যাঁ সিম্পল ভাবে সাজবেন। মুখে অতিরিক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করতে নিষেধ করবেন। আপনার সাথে আমার দেখা হচ্ছে সরাসরি বিয়ের দিন। বুঝছেন?”

মুনতাহা কেবল রিপ্লাই তে বলল-

“ জ্বি বুঝেছি। আপনার আমার পরশু দেখা হচ্ছে তবে। ”

মুনতাহা হিজাব গুলো আলমারিতে তুলে রাখলো। তার নানা বাড়ির লোকজন চলে এসেছে। বাহিরে একটা গরু আনা হয়েছে। বসার ঘরে মেহেন্দির অনুষ্ঠানের জন্য বসার জায়গা করা হয়েছে।

মুনতাহার মামিরা এসে থেকেই ঠেস মেরে মেরে কথা বলছে। সিমরানকেও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এ বাড়িতে। সিমরান এদের কাউকেই দেখতে পারে না। মুনতাহার মামিরা বলছে-

“ বাহ্ মুনতাহা তো ভালোই বশ করতে জানে। ছোট ছেলের বউ হতে পারে নি বলে বড় ছেলের বউ হয়ে যাচ্ছে ও বাড়িতে! লোভী মেয়ে একটা। ও বাড়ির বউ হয়েই ছাড়লো! ”

সিমরান গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে জবাব দিলো-

“ বিয়ে খেতে এসেছেন নাকি কুটনামি করতে এসেছেন বলুন তো? এসে থেকেই দেখছি এই একই পেঁচাল পারছেন। ভালো কিছু ভাবতে পারেন না? সব শুধু নেগেটিভ আর বাজে কথাবার্তা। ”

মামিদের মুখ কালো হয়ে গেলো। সিমরান কে শুনিয়ে শুনিয়েই তো বলছিলো কথা গুলো। ও মেয়ে তাহলে মুনতাহার সাপোর্ট নিয়ে কথা বললো কেনো?

পরের দিন টেইলার্স থেকে মুনতাহার ব্লাউজ আর পেটিকোট আসে। তবে সে তো ব্লাউজের হাতা কনুই অব্দি দিয়েছিল। এ তো ফুল হাতার ব্লাউজ। মা'কে জিজ্ঞেস করতেই মা জানালেন- সে ফোন করে বলেছিল ফুল হাতা দিতে।

মুনতাহা ব্লাউজ গুলো আলমারিতে রেখে মেহেন্দির জন্য রাখা গারারা ড্রেসটা বের করলো। হালকা সবুজ রঙের ওপর সূক্ষ্ম কাজ করা। চোখে পড়ার মতো, ভারী কোনো কাজ নেই। পোশাকটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজেকে অন্যরকম লাগলো। একটু লাজুক, একটু শান্ত… আর খুব নিজের মতো। এর মাঝেই পার্লার থেকে দুইজন আপু এসে পৌঁছালো। ঘরের ভেতরেই তাদের বসানো হলো। বাইরের কোনো পুরুষ, বা কোনো অচেনা মানুষ নেই। তার কাজিন আর, ও বাড়ির লোকজন।

পার্লারের আপুরা সুন্দর করেই সাজাতে শুরু করলো মুনতাহাকে। ভারী মেকআপ না। হাল্কা ভাবেই সাজালো। হুমুক যে সেটাই দেওয়া। সাজানো শেষে মুনতাহা আয়নায় তাকিয়ে নিজেকেই চিনতে পারলো না কিছুক্ষণ। এত সাদামাটা সাজ, তবুও এত সুন্দর!

বিকেলের পর ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর জমে উঠলো ছোট্ট অনুষ্ঠান। মির্জা বাড়ি থেকে সিকান্দারের ফুফু ফুপাতো বোন লাবণ্য,দাদি মনোয়ারা মির্জা এসেছিল। মুনতাহার খালা, মামি, কাজিনরা সবাই মিলে এক উষ্ণ, আপন পরিবেশ। কোথাও কোনো উচ্চস্বরে গান নেই, ডিজে নেই, অশালীন কিছু নেই। বড় পুরুষরা বাহিরে বিয়ের অন্যসব কাজ করতে ব্যস্ত।

ইলা আসলো সন্ধ্যার আগ দিয়ে। সবুজ রঙের জামদানী শাড়ি পড়েছে। চুল গুলো ছেড়ে দেওয়া। তারও সিম্পল সাজ। ফোন টিপতে টিপতে ভেতরে ঢুকছিলো।

আর নাদিম বাবার ওয়ালেট টা নিয়ে বের হচ্ছিল। পথিমধ্যে দু'জনে জোরেসোরে একটা ধাক্কা খেলো। ইলা মাথায় ব্যথা পেয়েছে। ইলার রাগ হলো। মাথা চেপে ধরে বলল-

“ অসভ্য কানা দেখে চলতে পারেন না?”

নাদিম চোখ তুলে তাকালো। ইলাকে দেখলো। তবে চিনলো না। হয়তো সেজে আছে সেজন্য।

“ আপনি অসভ্য কানা। ”

নাদিম চলে গেলো। ইলা ঘাড় ঘুরিয়ে নাদিমের চেহারাটা দেখেই চিনে ফেললো এটা শপিং মলের ঐ অসভ্য টা। কিন্তু এ বাড়িতে কি? মুনতাহার রিলেটিভ নাকি? যাক গে সে যাই হোক। বেয়াদব ছেলে একটা। ইলা ভেতরে এসে দেখলো মেহেন্দির অনুষ্ঠান অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। পিচ্চি পিচ্চি ছেলেমেয়েরা আনন্দ করছে। মেহেদী আর্টিস্ট এসেছে। সবাইকে মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছে। ইলা গিয়ে পাশে বসলে মুনতাহার। পাশ থেকে আরেক মেহেদি আর্টিস্ট ইলার হাতেও মেহেদী লাগিয়ে দিতে লাগলো।

মুনতাহার দু হাত ভর্তি মেহেদী লাগানো হলো। হাতের মাঝখানে সিকান্দারের নাম লিখে দেওয়া হলো ছোট্ট করে। ইলাকে জিজ্ঞেস করলো তার হাতে কোনো নাম লিখে দিবে কি না? তার কেউ আছে কি না?

ইলা বললো-

“ বা হাতে লিখে দেন সিঙ্গেল লাইফ ইজ জিঙ্গালালা। মাই ফিউচার হাসবেন্ড ইজ লাপাত্তা।”

মেহেদী আর্টিস্ট সত্যি সত্যি সেটাই লিখে দিলো। মুনতাহার মামি রা হাত ভরে মেহেদী দিয়ে এখন পা ভরে মেহেদী দিচ্ছে। সিমরান সেটা দেখে বিরবির করে বলল- হাভাতের দল।

মেহেদীর অনুষ্ঠান শেষে ছবি তোলা হলো। ছবিটবি তোলা শেষ হতে হতে রাত ১০ টা বেজে গেলো। এত রাতে একা ইলা কিভাবে বাসায় যাবে! অন্যের বাসায় তো রাত থাকা এলাউ না তার। একা একা যাওয়াটাও রিস্কি। মুনতাহা তখন নাদিম কে ডাকলো। নাদিম বাগানে একটা লাইট লাগাচ্ছিলো,আগের টা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল সেজন্য। মুনতাহা ডাকায় হাতের কাজ টা শেষ করে যেতেই সে বলল-

“ ভাইয়া আপনি কি একটু ইলা কে বাসায় দিয়ে আসবেন? আঙ্কেল বাসায় নেই। তা না হলে আঙ্কেলই আসতো নিতে। ”

নাদিম নামটা বিরবির করলো। ইলা! শুনেছিল নামটা। মুনতাহার বান্ধবী!

“ ঠিক আছে। আসুন। ”

মুনতাহা ইশারায় যেতে বলল। ইলা বিরবির করে জিজ্ঞেস করলো-

“ এটা কে হয় তোমার? উনি অনেক বদলোক। তার সাথে কেনো পাঠাচ্ছ? আর কেউ নেই?”

“ কি বলছো এসব? উনি নাদিম ভাইয়া। বদলোক কেনো বলছো? ”

ইলা যেন আকাশ থেকে পরলো।

“ এটা তোমার ঐ সৎ ভাই! এজন্যই এত পাঁজি। বদের হাড্ডি। ”

“ কি হলো আসুন?”

নাদিম যেতে যেতে ডেকে উঠলো।

“ যাও। রাত হচ্ছে তো। ”

ইলা বেরিয়ে গেলো। নাদিম তার বাইকটা বের করে বলল-

“ উঠুন। ”

ইলার চোখ কপালে।

“ আমি বাইকে বসবো! ”

“ না আমার কোলে বসবেন। আসুন বসুন। ”

ইলা বিরবির করলো- বেয়াদব।

“ কি হলো উঠুন। না গেলে বলুন। শুধু শুধু আমার সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়?”

ইলা উঠে বসলো। দুজনের মাঝে মনে হলে এক হাত দূরত্ব। নাদিম বাইক স্টার্ট দিয়ে বলল-

“ বাইক থেকে পরে হাত পা ভাঙলে তখন আমার দোষ দিলে খবর আছে। বাইক উঠিয়ে দিব শরীরের উপর দিয়ে বলে রাখলাম। ”

ইলা সাথে সাথে তাল সামলাতে না পেরে নাদিমের উপর পরে গেলো।

“ আপনি তো ভারী অসভ্য লোক। মেয়েদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানেন না? আর এভাবে খবিশের মতো বাইক টান দিলেন কেনো? ”

“ না জানি না কিভাবে মেয়েদের সাথে কথা বলতে হয়। আপনি শেখাবেন? আর আমি বাইক এভাবেই চালাই। ”

ইলা সরে আসলো। বাইকের পেছনে হাত রেখে মুখ ভেঙিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বলল-

“ ধীরে সুস্থে চালাবেন বাইক। ফেলে দিলে আসলেই আপনার খবর আছে। ”

নাদিম আয়নায় ইলাকে দেখলো। মাইয়া বাইকে পায়ের উপর পা তুলে বসছে! ওরে নবাবজাদীর বংশধর! বাঁকা হেসে আরো জোরে স্পিড বাড়ালো। ইলা চেপে ধরলো নাদিমের কাঁধ। ভয়ে চিৎকার করে বলল-

“ ওরে আল্লাহ! এই খবিশ,জাউরা বেডা,আস্তে চালান। আমার কলিজা উড়ে গেলো রে। ”

নাদিম ফুল মাস্তিতে বলল-

“ আপনি উড়ে যেতে পারেন না? বাইকে কেউ এভাবে বসে? বসতে হয় আঁটসাঁট করে জড়িয়ে ধরে। ধরুন তো আমাকে তারপর দেখুন কালবৈশাখী ঝড় আসলেও আপনাকে উড়িয়ে নিতে পারবে না। ”

“ আমার এখনো বিয়ে হয় নি। ”

“ বিগ আসস সিস্টার। ”

“ আস্তে চালান ভাই। অকালে মরতে চাই না। ”

নাদিম স্পিড কমিয়ে দিয়ে বলল-

“ ভালো ভাবে বসুন তাহলে। ”

ইলা ভালো ভাবে বসলো। নাদিমের কাঁধে এক হাত রেখে শার্ট চেপে ধরলো। বাড়ির কাছে আসতেই ইলা বলল-

“ সাইডে রাখুন। এসে গেছি। ”

নাদিম বাইক থামালো। ইলা গাড়ি থেকে নেমে বলল-

“ থ্যাংক'স। ”

নাদিম বাইক টা ঘুরিয়ে একটানে চলে যেতে যেতে বলল-

“ আপনার ধন্যবাদ আপনার ভ্যান্টি ব্যাগে ভরে রাখুন মিস ঢিলা। আমার কোনো কাজে আসবে না এটা। ”

ইলা রাগে কিড়মিড় করে উঠলো। তার এত সুন্দর নামটাকে এভাবে নাম ভেঙানো! নাদিমের দিকে তাকিয়ে রেগে বলল-

“ বাইক নিয়ে খাম্বার সাথে বাড়ি খা বেয়াদব। বাইক তো নয়, এ যেন এরোপ্লেন। ”


🌸

পরের দিন সকালে গায়ে হলুদ ছোঁয়ানো হলো মুনতাহাকে। বসার ঘরেই করা হলো। হলুদ লাগানো শেষে গোসল সেরে বের হতেই তাকে বিয়ের জন্য সাজানো হলো।

গতকাল রাতে সুনেহরা এসেছে মির্জা বাড়িতে। সেলিম মির্জা গিয়ে নিয়ে এসেছে। সিকান্দার কে হলুদ লাগানো হয়েছিল সকালে। তবে খুব বেশি লাগাতে দেয় নি। বেশি লাগালে দাগ বসে যাবে শরীরে এজন্য। সে গোসল সেরে বিয়ের জন্য আনা পাঞ্জাবি আর কোটি টা পড়ে নিলো। মাথার ভেজা চুল গুলো শুকিয়ে সেট করলো। শরীরে আতর মাখলো। শেষে পাগড়ি পরলো মাথায়। তারা সরাসরি মসজিদে যাবে। সেখানেই বিয়ে পরিয়ে তারপর বিয়ে বাড়ি যাবে।

সিকান্দার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলো শেষবার। বাড়ির গেটের সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে। সেলিম মির্জা মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে আছেন। এত বড় মানুষ, অথচ আজ ছেলের কথায় সবকিছু ছোট করে ফেলতে হয়েছে। মনলর ভেতর রাগ ভরা। অর্নব মায়ের সাথে দাঁড়ানো। সুনেহরা আর লাবন্য গাড়িতে বসে আছে। সিকান্দার গাড়িতে উঠলো। সাথে তার বাবা ফুপা ও কয়েকজন নিকট আত্মীয়। গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো মসজিদের দিকে। আর মেয়ে সদস্য রা যাবে ও বাড়িতে।

ও বাড়ি থেকে নাদিম, সালমান মির্জা,মুনতাহার খালু আর এক মামা আসলো মসজিদে।

মসজিদের ভেতরটা নিরিবিলি, প্রশান্ত। সাদা দেয়াল, মেঝেতে সবুজ জায়নামাজ বিছানো। ইমাম সাহেব ইতোমধ্যে বসে আছেন। সিকান্দার গাড়ি থেমে মসজিদের ভেতর ঢুকল সামনের সারিতে বসলো। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে… ১৩ বছরের অপেক্ষা, আজ যেন এক বিন্দুতে এসে থেমেছে।

ওদিকে, মুনতাহা নিজের ঘরে বসে আছে। বিয়ের লালচে আভাযুক্ত সাদামাটা শাড়ি, মাথা ঢেকে রাখা হিজাব। তার উপর দোপাট্টা। পাশে সিকান্দারের দাদি আর তার নানি। সামনে কাজি সাহেব।

মুনতাহা জানতো না যে তাদের বিয়েটা এভাবে হবে। সিকান্দার মসজিদে যাবে।
কাজি সাহেব সেলিম মির্জা কে ফোন করে জিজ্ঞেস করলো-

“ মোহরানা কত বাঁধবো? ”

সেলিম মির্জা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন। সিকান্দার জবাবে বলল-

“ আমার ৯ বছর ধরে জমানো সবটা সেভিংস। ”

“ পরিমান?”

“ ৩২ লাখ একশত এক টাকা। আর আমি এটা আজই পরিশোধ করে দিব। ”

কাজি সাহেব মাশাল্লাহ বলে উঠলেন। মুনতাহার দিকে তাকিয়ে বললেন-

“ পিতা শরিফুল ইসলাম,ও মাতা ময়না বেগমের কন্যা,মুনতাহা মুন। আপনি কি পিতা সেলিম মির্জা, মাতা হুমায়রা বেগমের পুত্র সিকান্দার শাহ্ মির্জা কে ৩২ লাখ একশত এক টাকায় নির্ধারিত মোহরানার বিনিময়ে স্বামী হিসেবে কবুল করছেন? করে থাকলে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল করছি। ”

মুনতাহার বুক কেঁপে উঠলো। যাকে সে কোনোদিন দেখে নি। বাবা বলে ডাক দেয় নি। সেই লোকটার মেয়ে হিসেবে ডাকা হচ্ছে। সেই লোকটার নাম উল্লেখ করা হচ্ছে! অদ্ভুত জীবন।

চোখ ভিজে এলো মুনতাহার। ঠোঁট কাঁপছে। পাশ থেকে দাদি নানি ইলা সবাই সাহস যোগাচ্ছে। অথচ এই সময় টাতে দরকার হয় মায়ের শক্ত হাতের ভরসা। অথচ তার মা আজও নেই তার কাছে। সেলিম মির্জার ফোন টা লাউডস্পিকারে থাকায় কথাবার্তা সব কানে আসছে। সিকান্দার মাথা নিচু করে রেখেছে।

মুনতাহা লম্বা করে শ্বাস টেনে ধীর কণ্ঠে বলল-

“ আলহামদুলিল্লাহ … কবুল করছি। ”

“ আবার বলুন। ”

“ আলহামদুলিল্লাহ.. কবুল করছি। ”

“ আর একবার।”

“ আলহামদুলিল্লাহ.. কবুল করছি। ”

মসজিদের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো এক মুহূর্ত। কাজি সাহেব রেজিস্ট্রার পেপার টা মুনতার দিকে বাড়িয়ে দিলো। মুনতাহা কাঁপা কাঁপা হাতে সাইন করলো। কি আশ্চর্য তার মা এবারও আসলো না তার কাছে! একটুর জন্যও দেখা পেলো না মায়ের!

কাজি এবার মসজিদে চলে গেলো। সিকান্দারের সামনে বসে বললেন-

“ পিতা সেলিম মির্জা। মাতা হুমায়রা বেগমের পুত্র সিকান্দার শাহ্, আপনি কি পিতা শরিফুল ইসলাম মাতা ময়না বেগমের কন্যা মুনতাহা মুন কে আপনার নির্ধারিত মোহরানার বিনিময়ে স্ত্রী হিসেবে কবুল করছেন? কবুল করলে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল করছি। ”

সিকান্দার চোখ বন্ধ করে এক সেকেন্ডের জন্য নিঃশ্বাস নিলো। তারপর বলল-

“ আলহামদুলিল্লাহ… কবুল করছি। ”

তিনবার কবুল বলা শেষ হতেই কাজি বললেন-

“ আলহামদুলিল্লাহ… উভয়ের সম্মতিতে এই নিকাহ সম্পন্ন হলো। এখন থেকে আপনারা স্বামী স্ত্রী হিসেবে বৈধ হালাল ও সম্মানিত বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। ”

কাজি সাহেবের বলা কথাটা শোনা মাত্রই সিকান্দার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। সোজা সিজদায় লুটিয়ে পড়লো। কাঁপা কণ্ঠে রবের উদ্দেশ্যে বলল-

“ ইয়া রব… ১৩ বছরের ধৈর্যের প্রতিদান আজ দিলেন…আপনার রহমতে আমি তাকে হালালভাবে পেলাম…আলহামদুলিল্লাহ…আলহামদুলিল্লাহ। আমি আপনার কাছে আজীবন ঋণী থাকবো রব। ”

সিকান্দারের চোখ ভিজে গেছে। তার একতরফা ভালোবাসা অবশেষে আজ জিতে গেছে।

মসজিদের ভেতর মিষ্টি একটা আবহ ছড়িয়ে পড়লো। একজন খেজুর ভর্তি থালা এনে সামনে রাখলো। সিকান্দার নিজ হাতে খেজুর তুলে নিলো। তারপর হালকা করে চারদিকে ছড়িয়ে দিলো। খেজুরের টুকরো গুলো ছড়িয়ে পড়লো জায়নামাজের ওপর। সবাই হাসিমুখে তা কুড়িয়ে নিলো।

ওদিকে, মুনতাহার চোখ দিয়ে ননস্টপ টুপটুপ করে পানি পড়ছে। তার এখন চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পারছে না। এত এত মহিলা রয়েছে তার রুমে।

মসজিদ থেকে সিকান্দাররা বেরিয়ে সালমান মির্জার বাড়িতে আসলো। বর এসেছে বর এসেছে শুনে মুনতাহার রুম থেকে মানুষ একে একে সরে যেতে লাগলো।

মুনতাহার কানে যখন গেলো বর এসেছে বর এসেছে তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো। রুম আস্তে আস্তে ফাঁকা হতে লাগলো।

কেউ শেষবারের মতো ঘোমটা ঠিক করে বেরিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে।

পায়ের ধুপধাপ শব্দ বাড়ছে…আর সেই শব্দ শুনেই যেন মুনতাহার শ্বাস আটকে আসছে।
সে চুপচাপ বসে আছে, হাতের আঙুলগুলো জড়িয়ে ধরেছে নিজেরই। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ভারী। হঠাৎ দরজার বাইরে থামলো পায়ের শব্দ। তারপর দরজাটা আস্তে করে খুলে গেলো।

সিকান্দার ভেতরে ঢুকলো। সাদা পাঞ্জাবি, পাগড়ি, চোখে স্থিরতা। তার সদ্য বিয়ে করা স্ত্রী কে একনজর দেখার তৃষ্ণা চোখ মুখে স্পষ্ট।

দরজা দিয়ে ঢুকেই সিকান্দার প্রথমে সালাম দিলো মুনতাহাকে। কণ্ঠটা ভারী, কিন্তু শান্ত।

মুনতাহা মাথা নিচু করে এক হাত ঘোমটা টেনে বসে আছে। তার চোখে পানি জমে আছে, কিন্তু পড়ছে না। ঠোঁট কাঁপছে। কোনো রকমে সালামের জবাব টা দিলো।

সিকান্দার ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। পেছন পেছন দাদি আর মুনতাহার নানিও আসলো। দাদি বাহুতে ধাক্কা দিয়ে বলল-

“ বউয়ের ঘোমটা সরা ছ্যামড়া। বউয়ের রাঙা মুখটা দেইখা কলিজা ঠান্ডা কর। ”

সিকান্দার হাত বাড়িয়ে মুনতাহার ঘোমটা তুললো। সাথে সাথে লাজুকলতা নারীর রাঙা মুখটা নজরে আসলো। তার ঠোঁট কাপছে তরতর করে। চোখের পাপড়ি ফেলছে ঘনঘন। সিকান্দার ঠোঁটে কোণে আওড়ালো সদ্য বিয়ে করা বউয়ে মুখ দেখে- “ মাশা-আল্লাহ! ” তার রবের সৃষ্টি এই নারীটা এখন কেবল সিকান্দারের! শুধুই সিকান্দারের। আর কোনো ভয় নেই হারানোর। নেই কোনো সংশয়। মুহূর্তে তৃষ্ণা যেন আরো বেড়ে গেলো। দাদির দিকে তাকিয়ে বলল-

“ দাদিজান,স্পর্শ করতে পারবো এখন? নাকি আরো অপেক্ষা করবো? ”

“ আর অপেক্ষা করবা ক্যান? একটা চুমু খাও বউয়ের গালে। তোমারই তো বউ এখন। একেবারে হালাল বউ। ”

সিকান্দার এগিয়ে গিয়ে মুনতাহার গালে আলতো করে হাত রাখলো। এই তাকে সিকান্দারের প্রথম স্পর্শ করা। অদ্ভুত শান্তি আছে এই ছোঁয়াতে। বুক কলিজা জুড়িয়ে যায়। মুনতাহা বুঝি কেঁপে উঠলো এই স্পর্শে। সিকান্দার মুনতাহার কাঁপুনির মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য কপালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো। সেই সাথে বিরিবির করে বলল-

❝ ধ ্স কমেন্ট করবেন বেশি করে ]

পেজটা ফলো দিবেন

Want your business to be the top-listed Media Company in Patenga?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Address


Rahattar Pool
Patenga