Abta Nadia

Abta Nadia

Share

নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি,নদিয়া জেলা শাখা।
শিক্ষার দাবি,জাতীয় দাবি
জাতীয় মানতে হবে।

19/06/2026

*_দেশভাগের ইতিহাস :_*
*_যে কথা মৌলবাদী রাজনীতির আড়ালে হারিয়ে যায়_*
”"""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""

১৯৪৭ সালের দেশভাগ ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর ক্ষতচিহ্ন। মানুষের মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি, এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলা স্মৃতির যন্ত্রণা নিয়ে আজও সীমান্তের কাঁটাতার সেই ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে।

এই ভাগ শুধু মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখা নয়, মানুষের বুকের উপর দিয়ে ছুরি চালিয়ে আধখানা করে দেওয়ার থেকেও কষ্টকর।

কিন্তু আজকের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি সেই জটিল ইতিহাসকে একটি সরল, বিদ্বেষমূলক বয়ানে পরিণত করছে — যেন ভাগের জন্য একমাত্র দায়ী মুসলিম লিগ এবং মুসলমান সম্প্রদায়।

এই বয়ান কেবল অর্ধসত্য নয়, এটি ইতিহাসের সঙ্গে সুচিন্তিত প্রতারণা। তথ্য ও গবেষণার আলোয় এই মিথকে ভাঙা দরকার।

হিন্দুত্ববাদী আখ্যানের কেন্দ্রে আছে - মুহম্মদ আলি জিন্নাহ ও মুসলিম লিগের দ্বিজাতি তত্ত্বই দেশ ভাগের মূল কারণ। জিন্নাহ নিশ্চয় দায়ী এবং তার সাথে দায়ী অন্যান্যরাও।

ঐতিহাসিক সত্য হল এই জিন্নার আগেই দ্বিজাতি তত্ত্ব সমান্তরালভাবে হিন্দু মহাসভাতেও প্রচারিত হচ্ছিল।

বিনায়ক দামোদর সাভারকর — হিন্দুত্বের প্রধান তাত্ত্বিক — ১৯৩৭ সালে হিন্দু মহাসভার আহমেদাবাদ অধিবেশনের সভাপতির ভাষণে স্পষ্ট বলেছিলেন: "ভারত দুটি জাতি নিয়ে গঠিত — হিন্দু এবং মুসলমান।"

জিন্নাহ এই একই কথা বলেছিলেন ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবে।
অর্থাৎ দ্বিজাতি তত্ত্ব এককভাবে কোনো এক পক্ষের উদ্ভাবন নয় — এটি উভয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যৌথ ফসল।

A. G. Noorani তাঁর The RSS: A Menace to India গ্রন্থে বলেছেন - যে RSS ও হিন্দু মহাসভার বিভাজনমুখী রাজনীতি দেশ ভাগের পরিবেশ তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল।

আয়েশা জালাল তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan (১৯৮৫)-এ দেখিয়েছেন যে জিন্নাহ মূলত পাকিস্তানকে একটি দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছিলেন — তাঁর আসল লক্ষ্য ছিল একটি ফেডারেল বা কনফেডারেল ভারতে মুসলমানদের জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষা।

কিন্তু নেহরু ও প্যাটেল সেই সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কারণ তাঁরা দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর চাইছিলেন এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন।

রামচন্দ্র গুহ তাঁর India After Gandhi (২০০৭) গ্রন্থে লিখেছেন যে মাউন্টব্যাটেনের ত্বরান্বিত পরিকল্পনায় কংগ্রেস নেতারা স্বেচ্ছায় সম্মতি দিয়েছিলেন।

মুশিরুল হাসান তাঁর Legacy of a Divided Nation (১৯৯৭) গ্রন্থে আরও বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন যে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার লড়াই কীভাবে বিভাজনকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

হিন্দুত্ববাদী বয়ান ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দায়কে সুকৌশলে আড়াল করে। অথচ ইতিহাসের পাঠ বলে, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বীজ ব্রিটিশ শাসনই বপন করেছিল — পরিকল্পিতভাবে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল এই নীতির প্রথম বড় প্রয়োগ — হিন্দু ও মুসলমানদের আলাদা প্রশাসনিক এককে বিভক্ত করে তাদের মধ্যে স্বার্থের বিরোধ তৈরি করা।

১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কারে প্রথমবারের মতো সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে আলাদা ভোটাধিকার দেওয়া হয়, যা হিন্দু-মুসলমানকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিল।

Yasmin Khan তাঁর The Great Partition: The Making of India and Pakistan (২০০৭) গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন যে সাইরিল র‍্যাডক্লিফ মাত্র পাঁচ সপ্তাহে বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমারেখা টেনেছিলেন — এমন একজন আইনজীবী যিনি এই অঞ্চলে কখনো আসেননি, এখানকার ভাষা, সংস্কৃতি বা ভূগোল সম্পর্কে যাঁর কোনো প্রত্যক্ষ জ্ঞান ছিল না। সেই অযত্নের, তাড়াহুড়োর রেখা চিহ্ন লক্ষ লক্ষ মানুষকে উদ্বাস্তু জীবনে ঠেলে দিয়েছিল। এই দায় কোনো ভারতীয় সম্প্রদায়ের নয় — ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের।

বাংলার ভাগ নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য হিন্দুত্ববাদী বয়ানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ১৯৪৭ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসু মিলে অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন — একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সম্মিলিত বাংলা রাষ্ট্রের স্বপ্ন। এই প্রস্তাব নেহরু ও প্যাটেল নাকচ করেছিলেন — কিন্তু শুধু তাঁরাই নন। বাংলার ভেতর থেকেই এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সক্রিয় বিরোধিতা এসেছিল।

ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জি তাঁর যুগান্তকারী গবেষণাগ্রন্থ Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932–1947 (Cambridge University Press, ১৯৯৪)-এ এই বিস্মৃত সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর মূল থিসিস ছিল: বাংলার বিভাজন কেবল মুসলিম লিগের দাবির ফলাফল নয় — এটি ছিল বাংলার হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সক্রিয় এবং সুপরিকল্পিত অর্জন।

তিনি তথ্য ভিত্তিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ১৯৩২ সালের পর থেকেই বাংলার হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পশ্চিমবঙ্গের জন্য আলাদা প্রদেশের দাবি তুলতে শুরু করেছিল।

এর মূল কারণ ছিল শ্রেণিগত ভয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের পরে নির্বাচনী রাজনীতি শুরু হলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষক সমাজ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে রাজনৈতিক ক্ষমতায় আসবে। হিন্দু জমিদার শ্রেণি এবং কলকাতাকেন্দ্রিক বাবু সমাজ — যারা বহু শতাব্দী ধরে পূর্ববঙ্গের ভূমি ও বাণিজ্যের উপর কর্তৃত্ব ভোগ করে এসেছিল — তারা এই পরিবর্তনকে তাদের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখেছিল।

তিনি দেখিয়েছেন যে হিন্দু বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছে "বাঙালি জাতীয়তাবাদ" এবং "হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা" কীভাবে অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছিল।

রবীন্দ্রনাথের ভাষা ও সংস্কৃতির বাংলা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের বাংলা — এই দুইকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছিল। ফলে মুসলমান বাঙালিকে কার্যত বাঙালি সংস্কৃতির বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল।

তাঁর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: ১৯৪৬-৪৭ সালে হিন্দু মহাসভা এবং বাংলা কংগ্রেসের হিন্দু নেতারা অবিভক্ত বাংলার পক্ষে একটি গণভোটের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি নিয়ে একটি পৃথক পশ্চিমবঙ্গ, যেখানে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য অক্ষুণ্ণ থাকবে।

তিনি এই প্রক্রিয়াকে বলেছেন "হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক বিজয়" — যা ইতিহাসের পাতায় চাপা পড়ে গেছে।
আজকের প্রেক্ষিতে এই গবেষণার রাজনৈতিক তাৎপর্য অপরিসীম।

আজকের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যে বয়ান দেয় — "মুসলমানরা বাংলাকে ভেঙেছে" — জয়া চ্যাটার্জির দলিলভিত্তিক গবেষণা সেই বয়ানকে নস্যাৎ করে ।
সত্য হল,বাংলার বিভাজনে সে দিনের হিন্দু অভিজাত শ্রেণির সম্মতি এবং উৎসাহ ছিল সমানভাবে — কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশিই — সক্রিয়।

হিন্দুত্ববাদী প্রচার দাবি করে যে কেবল হিন্দুরাই দেশ ভাগের শিকার হয়েছিলেন। সংখ্যা ও তথ্য ভিন্ন কথা বলে। পাঞ্জাবে হিন্দু, শিখ ও মুসলমান — তিনটি সম্প্রদায়ই সমানভাবে নৃশংস সহিংসতার শিকার হয়েছিল। Urvashi Butalia তাঁর The Other Side of Silence: Voices from the Partition of India (১৯৯৮) গ্রন্থে শত শত মৌখিক সাক্ষ্য সংগ্রহ করে দেখিয়েছেন সব সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ এই নৃশংসতার শিকার হয়েছিলেন।

আজকের ভারতে দেশ ভাগের ইতিহাসকে ঘৃণার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় তাঁর The Nation and Its Fragments (১৯৯৩) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে জাতীয়তাবাদী ইতিহাস-রচনা সবসময়ই নির্বাচিত স্মৃতির উপর দাঁড়িয়ে থাকে — কিছু ঘটনাকে সামনে আনে, কিছুকে ঢেকে রাখে।

হিন্দুত্ববাদী বয়ানও তাই করে: ব্রিটিশের দায়, কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত, হিন্দু মহাসভার ভূমিকা — এগুলি আড়াল করে শুধু মুসলমানকে দোষী করা হয়।

জ্ঞানেন্দ্র পান্ডে তাঁর Remembering Partition: Violence, Nationalism and History in India (২০০১) গ্রন্থে এই ঘটনাকে বলেছেন "ইতিহাসের রাজনৈতিক ব্যবহার" — যা বর্তমানের বিভাজনকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য অতীতকে নতুন করে লেখে।

দেশভাগের প্রকৃত শিক্ষা হলো—মানুষকে যদি ধর্মের খাঁচায় বন্দি করা হয়, তবে শেষ পর্যন্ত সবই হারিয়ে যায় ।

সত্যিকারের ইতিহাস কখনও একরেখার গল্প নয়। সেখানে কোনো একক ভিলেন নেই, কোনও একক শিকারও নেই।

আছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র, উভয় পক্ষের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, নেতাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, এবং লক্ষ কোটি সাধারণ মানুষের অসহায় কান্না।

ইতিহাসের উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নয়, প্রজ্ঞা।

"""""'""'''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''

গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্র :-
১. Ayesha Jalal — The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan, Cambridge University Press, 1985.

২. Joya Chatterji — Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932–1947, Cambridge University Press, 1994.

৩. Yasmin Khan — The Great Partition: The Making of India and Pakistan, Yale University Press, 2007.

৪. Urvashi Butalia — The Other Side of Silence: Voices from the Partition of India, Duke University Press, 1998.

৫. Ramachandra Guha — India After Gandhi: The History of the World's Largest Democracy, HarperCollins, 2007.

৬. Mushirul Hasan — Legacy of a Divided Nation: India's Muslims Since Independence, Westview Press, 1997.

৭. Partha Chatterjee — The Nation and Its Fragments: Colonial and Postcolonial Histories, Princeton University Press, 1993.

৮. Gyanendra Pandey — Remembering Partition: Violence, Nationalism and History in India, Cambridge University Press, 2001.

৯. A. G. Noorani — The RSS: A Menace to India, LeftWord Books, 2019.

১০. V. D. Savarkar — Presidential Address, Hindu Mahasabha, Ahmedabad Session, 1937.

••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••

Want your school to be the top-listed School/college in Krishnagar?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Telephone

Address


Satyapriya Bhavan, Patramarket
Krishnagar
733102